চৈত্রের প্রথম দিনেই উত্তর জেলার ধর্মনগর মহকুমার কদমতলা ব্লকের একাধিক গ্রামে আছড়ে পড়ল অকাল কালবৈশাখীর তীব্র ঘূর্ণিঝড়। রবিবার গভীর রাতে আচমকা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন এলাকার বহু বাসিন্দা। ঝড়ের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় অন্তত পাঁচটি গ্রাম, ভেঙে পড়ে বাড়িঘর, উপড়ে যায় গাছপালা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার দিনভর মেঘলা আকাশ ও মাঝারি বৃষ্টির পর রাত প্রায় বারোটা নাগাদ হঠাৎ করেই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নেয়। দমকা হাওয়ায় উড়ে যায় বহু বাড়ির টিনের চাল, উপড়ে পড়ে বড় বড় গাছ এবং বিদ্যুতের খুঁটি। ফলে রাতারাতি অন্ধকারে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চুরাইবাড়ি, ফুলবাড়ী, পূর্ব ফুলবাড়ী, পূর্ব চুরাইবাড়ি ও উত্তর ফুলবাড়ী পঞ্চায়েত এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড। চুরাইবাড়ি বাজার এলাকাতেও ঝড়ের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বহু দোকানের টিনের ছাউনি উড়ে গেছে, কোথাও আবার দোকানের কাঠামোই ভেঙে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ জানিয়েছেন, এই ক্ষতির ফলে তাদের বড় আর্থিক ধাক্কা খেতে হবে।
পূর্ব ফুলবাড়ী পঞ্চায়েতের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুজিত দত্ত, মিন্টু দত্ত, ময়না মিয়া, বিশ্বজিৎ দত্ত এবং প্রশান্ত দাসের বাড়িতে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে পাশের গাছের ওপর ঝুলে রয়েছে। একইভাবে চুরাইবাড়ি পঞ্চায়েতের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুরুচি গিরির বাড়িতেও গাছ উপড়ে পড়ে ঘর ভেঙে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের দাবি, এত তীব্র ঝড় তারা এর আগে খুব কমই দেখেছেন। হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে এমন দুর্যোগ নেমে আসায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। অনেক পরিবার রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে বা আশপাশের নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়ে।
ঘূর্ণিঝড়ের পর সোমবার সকাল থেকেই প্রশাসনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। কদমতলা ব্লকের চেয়ারম্যান মিহির রঞ্জন নাথ, সমিতির সদস্য হাসিম তালুকদার, ব্লকের ইঞ্জিনিয়ার, স্থানীয় তহশীলদার এবং উত্তর জেলার বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবকরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও।
প্রশাসনিক দল ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও সম্পত্তির বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন এবং দ্রুত সাহায্যের আশ্বাস দেন। চেয়ারম্যান মিহির রঞ্জন নাথ জানান, যেসব পরিবারের রান্নাঘর ভেঙে গেছে তাদের অবিলম্বে শুকনো খাবার সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি, যাদের বাড়িঘর ও গাছপালার ক্ষতি হয়েছে তাদের সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। তবে এখনও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি এবং ভেঙে পড়া গাছ সরানোর কাজ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পুনর্বাসন এবং স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা না করলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ আবারও মনে করিয়ে দিল, ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার অস্থিরতা কতটা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এখন সকলের নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—কত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটাই বড় প্রশ্ন।