নেপালে রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়া খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না। মাত্র এক মাস আগেই বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তরুণদের ‘পোস্টার বয়’, প্রাক্তন র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বালেন শাহ । দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নতুন যুগের সূচনা হবে— এমনটাই আশা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সেই আশার উপর এখন ঘনিয়ে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।রাজধানী Kathmandu থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কেন্দ্র Singha Durbar— সর্বত্রই বাড়ছে বিক্ষোভের আঁচ। রাস্তায় নেমেছেন ছাত্রছাত্রী, সাধারণ নাগরিক, এমনকি বিভিন্ন পেশার মানুষও। নতুন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গণতান্ত্রিক আলোচনার বদলে তারা বেছে নিচ্ছে কঠোর এবং দমনমূলক পথ। আর এই অভিযোগই ক্রমশ বিস্ফোরণের রূপ নিচ্ছে।বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত— রাজনৈতিক দলগুলির ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব। দীর্ঘদিন ধরেই নেপালের রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়নগুলির বড় ভূমিকা রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ভেঙে দিতে চাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকেই। শিক্ষার্থীদের দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার পড়ুয়া রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আন্দোলনের আগুন এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী অর্থনীতি নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ১০০ টাকার বেশি মূল্যের পণ্যের উপর বাধ্যতামূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য যাদের অনেকটাই ভারতের উপর নির্ভর করতে হয়, তাদের জীবনযাত্রা হঠাৎ করেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও দ্রুত বাড়ছে।এই দুই ইস্যু— ছাত্র রাজনীতি ও সীমান্ত বাণিজ্য— মিলে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে নতুন সরকারের জন্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত দ্রুত জনরোষের মুখে পড়া যেকোনো নতুন প্রশাসনের জন্যই বড় সতর্কবার্তা।এরই মধ্যে সরকারকে আরও চাপে ফেলেছে একাধিক রাজনৈতিক বিতর্ক। নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Sudan Gurung ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি নিজের সম্পত্তির পরিমাণ কম দেখিয়েছিলেন। বিতর্ক বাড়তেই দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। পাশাপাশি, ৯ এপ্রিল শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী Dipak Kumar Shah-কেও পদ থেকে সরানো হয়েছে।প্রসঙ্গত, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তীব্র জনআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী K P Sharma Oli। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেন দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি Sushila Karki। সেই প্রেক্ষাপটেই অনুষ্ঠিত হয় সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন, যেখানে ১৬৫টি আসনে লড়াই করে ৬৫টি রাজনৈতিক দল।এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ছিল Rastriya Swatantra Party-এর উত্থান। বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে নবগঠিত এই দল অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মাত্র এক মাসের মধ্যেই যে এতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি কেউ।বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে— জনপ্রিয়তা অর্জন যতটা সহজ, তা ধরে রাখা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে তরুণদের প্রত্যাশা যখন আকাশছোঁয়া, তখন সামান্য সিদ্ধান্তও বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে। এখন দেখার, এই বিক্ষোভের ঢেউ সামাল দিয়ে Balen Shah সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে কি না, নাকি এই অস্থিরতা নেপালের রাজনীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।