সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জঙ্গি কার্যকলাপের ঘটনার সঙ্গে বাংলার সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুললেন বিজেপি সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।সাংসদের দাবি, দেশের নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করতে গিয়ে রাজ্যের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলি উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর ফলে অনুপ্রবেশ ও জঙ্গি কার্যকলাপের ঝুঁকি বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।সীমান্ত সুরক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জানান, কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ প্রায় ৪৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকার সেই প্রস্তাবে যথাযথ সহযোগিতা করেনি। এর ফলে সীমান্তে নজরদারির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং অনুপ্রবেশ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।অনুপ্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করে সাংসদ দাবি করেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী Border Security Force (বিএসএফ) বহু অনুপ্রবেশকারীকে আটক করলেও পরবর্তী পর্যায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, প্রায় ১১ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে আটক করার পরও তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও এই দাবির বিষয়ে সরকারিভাবে কোনও নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি, তবুও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক কিছু জঙ্গি কার্যকলাপের তদন্তে বাংলার যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বেঙ্গালুরুর একটি বিস্ফোরণ মামলার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তদন্তে পশ্চিমবঙ্গের সংযোগ উঠে এসেছে বলে দাবি করেন। পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকা থেকে এক সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেফতারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে এই বিষয়গুলির সত্যতা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।এছাড়াও সাংসদ অভিযোগ করেন, রাজ্যে ভুয়ো নথিপত্র তৈরির একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যা উগ্রপন্থী কার্যকলাপকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। তাঁর মতে, এই ধরনের চক্র সক্রিয় থাকলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। যদিও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, রাজ্যে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী শাসকদলের নীতি। তিনি দাবি করেন, যদি বাংলায় বিজেপি সরকার গঠিত হয়, তাহলে এক মাসের মধ্যেই সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হবে। একইসঙ্গে রাজ্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গেও তিনি সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলির যথাযথ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। তিনি বিশেষভাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর বাড়ির সংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, এই ধরনের অবহেলা রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীনতার পরিচয় দেয়।নারী নীতির ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারকে কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর দাবি, নারী নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ নারী সংক্রান্ত বিলগুলিতে রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং যথাযথ সমর্থন দেওয়া হয়নি।সবশেষে তিনি বলেন, রাজ্যের সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চাইছেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তিমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, আগামী দিনে এই বিষয়গুলি রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।যদিও এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি, তবে বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ এবং আইনশৃঙ্খলার মতো সংবেদনশীল ইস্যু আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে।