ত্রিপুরার রাজনীতিতে আসন্ন এডিসি নির্বাচনকে ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে উত্তাপ। জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে রাজনৈতিক লড়াইয়ের আবহ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে খুমুলুঙে অনুষ্ঠিত এক বৃহৎ জনসমাবেশ থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তিপরা মথার প্রাক্তন সুপ্রিমো ও বর্তমান এমডিসি প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ।সভামঞ্চ থেকে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে দাবি করেন, আসন্ন এডিসি নির্বাচনে ২৮টি আসনেই তিপরা মথার কর্মীরাই বিজেপিকে পরাজিত করবে। তিপ্রাসা জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি কখনোই আপস করবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন।প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ অভিযোগ করেন, বর্তমানে বিজেপি, সিপিআই(এম) সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের ব্যবহার করে জনজাতিদের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, এই বিভাজনের রাজনীতি জনজাতি সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই তিনি গোটা তিপ্রাসা সমাজের কাছে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।তিনি বলেন, “আমাদের সমাজকে ভাগ করে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, তাহলে কোনো শক্তিই আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।”সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ডা.) মানিক সাহার সাম্প্রতিক ঘোষণারও উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে আসন্ন এডিসি নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি সবকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।এই প্রসঙ্গে প্রদ্যোত বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী যেহেতু তিপরা মথাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। বিজেপি তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পরই তিপরা মথা নিজেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবে।”ত্রিপাক্ষিক চুক্তির প্রসঙ্গেও এদিন মুখ খোলেন তিনি। প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ দাবি করেন, গত দুই বছর ধরে তিনি দিল্লির সঙ্গে লাগাতার আলোচনা ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে এই চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হয়। তিপ্রাসা জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি কোনোভাবেই আপস করবেন না বলেও জোর দিয়ে জানান।একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। তাঁর দাবি, শুধু তিপরা মথা দলকে ভাঙার চেষ্টা নয়, বরং তাঁকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।তিনি বলেন, “আমাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমি ভয় পাই না। তিপ্রাসা মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই আমি শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাব।”সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ত্রিপুরার ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, একসময় ত্রিপুরা ছিল মূলত জনজাতিদের ভূমি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অধিকার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।তিনি বলেন, “একসময় এই ভূমি আমাদের ছিল। ধীরে ধীরে আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আজ আবার নিজেদের অধিকার ফিরে পেতেই আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে।”প্রদ্যোত দেববর্মণ অভিযোগ করেন, এডিসি মূলত জনজাতিদের অধিকারভুক্ত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে সেই অধিকারও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে তিপরা মথা কখনোই এডিসি অন্য কারও হাতে তুলে দেবে না বলে তিনি স্পষ্ট জানান।তিনি বলেন, “এডিসি আমাদের অধিকার। আমরা এই অধিকার রক্ষা করব এবং কোনোভাবেই তা অন্যের হাতে যেতে দেব না।”তিপরা মথাকে ভাঙার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যারা এই ধরনের চেষ্টা করছে তাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রদ্যোত বলেন, নিজের জাতির স্বার্থে তিনি কোনো ধরনের আপস করবেন না।তিনি আরও বলেন, “এতদিন মানুষ আমার ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখেছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে আন্দোলনের কঠোর রূপ দেখানোর।”তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও তিনি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। অতীতের এক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২১ সালে তিপরা মথা এবং ত্রিপুরার আদিবাসী প্রগতিশীল ফ্রন্টের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে তিপ্রাসা সমাজের বড় ক্ষতি হয়েছিল।এই ধরনের ঘটনা যাতে আবার না ঘটে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি এবং তিপরা মথার মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকলেও গোটা জনজাতি সমাজের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।সভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক লড়াই হবে, মতের অমিল থাকবে। কিন্তু আমাদের নিজেদের সমাজের ক্ষতি যেন না হয়, সেটা সবাইকে মনে রাখতে হবে।”শেষে বিজেপির বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতি করার অভিযোগ তোলেন তিপরা মথার এই নেতা। তাঁর দাবি, বিজেপির লক্ষ্য জনজাতিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। তবে তিপরা মথা সেই পথে কখনোই হাঁটবে না।তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য বিভাজন নয়, ঐক্য। গরিব তিপ্রাসা মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই আমরা চালিয়ে যাব।”খুমুলুঙের এই জনসভা ঘিরে ত্রিপুরার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এডিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি ও তিপরা মথার মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তা এই সভা থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।