ত্রিপুরায় আসন্ন স্বশাসিত জেলা পরিষদ (এডিসি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যখন প্রার্থী বাছাই নিয়ে ব্যস্ত, তখন জনজাতি ছাত্র সংগঠন টিএসএফ (Tripura Students’ Federation) নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এনেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে সব রাজনৈতিক দলকে এডিসির ২৮টি আসনেই জনজাতি প্রার্থী দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।শনিবার আগরতলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরেন টিএসএফের সহ-সভাপতি জন দেববর্মা। তাঁর বক্তব্য, এডিসি মূলত জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার মানুষের স্বশাসনের জন্যই গঠিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই এই নির্বাচনে জনজাতি সমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সাংবাদিক সম্মেলনে জন দেববর্মা বলেন, ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের ২৪৪(২) এবং ২৭৫(১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ত্রিপুরার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো জনজাতি জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক প্রথাকে সুরক্ষা দেওয়া।তিনি আরও বলেন, “এডিসি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জনজাতি সমাজের অধিকার রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তাই এখানে এমন প্রতিনিধিদের প্রয়োজন, যারা জনজাতি সমাজের জীবনযাপন, সমস্যা এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে কাছ থেকে বোঝেন।”টিএসএফের মতে, জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা যেমন ভূমি সংক্রান্ত বিষয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে একজন স্থানীয় জনজাতি প্রতিনিধি অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেন। কারণ তিনি ওই এলাকার সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের চাহিদা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা রাখেন।সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আসন্ন এডিসি নির্বাচনে তিনটি সাধারণ আসনসহ মোট ২৮টি আসনেই জনজাতি প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলকে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে।এই প্রসঙ্গে সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী তালিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জন দেববর্মা বলেন, কিছু এলাকায় অ-আদিবাসী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যা জনজাতি সমাজের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মনু এবং ছৈলেংটা অঞ্চলের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওইসব এলাকায় অধিকাংশ বাসিন্দাই জনজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত। সেখানে অ-আদিবাসী প্রার্থী দিলে তারা কতটা মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।তাঁর বক্তব্য, “যেসব এলাকায় জনজাতি জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ একজন স্থানীয় জনজাতি প্রতিনিধি মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজনকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।”তবে টিএসএফের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, এই দাবির অর্থ কোনোভাবেই সাধারণ বা অ-আদিবাসী মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং এটি জনজাতি সমাজের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার একটি ন্যায্য দাবি।জন দেববর্মা বলেন, “আমাদের সংগঠনের কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের প্রতি বিরূপ মনোভাব নেই। আমরা শুধু চাই, এডিসির মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য যেন বজায় থাকে।”সাংবাদিক সম্মেলনে টিএসএফ সিপিআই(এম)-এর কাছে তাদের প্রার্থী তালিকা পুনর্বিবেচনার আহ্বানও জানায়। সংগঠনের মতে, জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় জনজাতি প্রার্থী দেওয়া হলে মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও আরও সুসংহত হবে।এছাড়াও টিএসএফ কংগ্রেস, আইপিএফটি, তিপরা মথা এবং বিজেপি সহ রাজ্যের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সংগঠনের দাবি, এডিসির সব আসনে জনজাতি প্রার্থী দেওয়া হলে জনজাতি সমাজের প্রতিনিধিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে এবং এডিসির সাংবিধানিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টিএসএফের এই দাবি এডিসি নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এই বিষয়টি নির্বাচনী আলোচনায় বড় ভূমিকা নিতে পারে।আসন্ন এডিসি নির্বাচনকে ঘিরে ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই টিএসএফের এই আহ্বান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই দাবির প্রতি কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা কতটা গুরুত্ব দেয়।