ঊনকোটি জেলার কৈলাসহর মহকুমার দেওরাছড়া এলাকায় এক বৃদ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত ব্যক্তির পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি হেফাজতে নির্মম মারধরের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি পুলিশ প্রশাসন। ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কৈলাসহরের গৌরনগর ব্লকের অন্তর্গত দেওরাছড়া এডিসি ভিলেজের তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনির মিয়া (৬৫) পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন। পারিবারিক একটি মামলার জেরে সম্প্রতি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর ডিভোর্সপ্রাপ্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিচ্ছিলেন না। সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কৈলাসহর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বৃহস্পতিবার রাত প্রায় দুইটা নাগাদ পুলিশ মনির মিয়ার বাড়িতে পৌঁছে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে গ্রেফতার করে। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় পুলিশ কর্মীরা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং গ্রেফতারের সময় মনির মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশালীন ও অভব্য আচরণ করেন। পরিবারের দাবি, মনির মিয়াকে বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে বের করে পুলিশ গাড়িতে তোলা হয় এবং সেখানেই তাঁকে মারধর করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হলেও পুলিশি গাড়ির মধ্যেই তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই মারধরের ফলেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন মনির মিয়া।
রাত প্রায় তিনটা নাগাদ পুলিশ মনির মিয়ার পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানায় যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁকে ঊনকোটি জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ পরিবারের সদস্যদের দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে রাতের কারণে পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যেতে পারেননি।
পরদিন ভোরবেলা পরিবারের সদস্যরা ঊনকোটি জেলা হাসপাতালে পৌঁছালে জানতে পারেন যে মনির মিয়া ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে উপস্থিত আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাত প্রায় ৩টা ১৫ মিনিট নাগাদ মনির মিয়াকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁকে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হলেও ভোর ৪টা ৪০ মিনিট নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। যদিও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে হাসপাতালের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি বলে অভিযোগ করেন সংবাদ প্রতিনিধিরা। এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মনির মিয়ার মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই দেওরাছড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমান। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কৈলাসহর থানার ওসি তাপস মালাকারের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং টিএসআর মোতায়েন করা হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়।
এ বিষয়ে কৈলাসহর থানার ওসি তাপস মালাকারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।
অন্যদিকে, মনির মিয়ার পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন যে পুলিশি অত্যাচার এবং মারধরের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ঊনকোটি জেলার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মনির মিয়ার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।