আগরতলা: গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে যুবকদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা রাজ্যের কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রবিবার আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে অনুষ্ঠিত ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের রাজ্যস্তরের কৃষক মেলা এবং রাজ্য ও জেলা স্তরের শ্রেষ্ঠ কৃষক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরেন রাজ্যের কৃষি ও কৃষক কল্যাণমন্ত্রী রতন লাল নাথ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কৃষকদের আরও বেশি উৎপাদন, উন্নত বাজার সংযোগ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, কৃষিক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয়ের উন্নয়ন ঘটলেই ভারত প্রকৃত অর্থে বিশ্ব গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। তিনি বলেন, ত্রিপুরার কৃষকেরাই রাজ্যের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।
মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে চারটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন—দরিদ্র, যুবক, নারী এবং কৃষক। এই চারটি শ্রেণির উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কৃষি মানে কেবলমাত্র চাষাবাদ নয়; এর সঙ্গে পশুপালন, বনায়ন এবং মৎস্যচাষও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সমস্ত ক্ষেত্র মিলিয়েই কৃষিক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে।
ত্রিপুরায় বর্তমানে প্রায় ৪.৭২ লক্ষ কৃষক রয়েছেন বলে জানান মন্ত্রী। রাজ্যের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪২.২২ লক্ষ। তাই কৃষকদের উন্নয়ন এবং কৃষিক্ষেত্রের প্রসার রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এই কৃষক মেলা মূলত সেই সমস্ত কৃষকদের সম্মান জানাতেই আয়োজন করা হয়েছে, যারা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে রাজ্যের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে বিশ্বের অন্যতম শস্য ভাণ্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ত্রিপুরায় কৃষি উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাজ্যে মোট প্রায় ৬৫ লক্ষ ৫৭ হাজার কানি জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ ১৭ হাজার কানি জমি বর্তমানে চাষের আওতায় রয়েছে এবং প্রায় ১৫ লক্ষ কানি জমিতে ধান উৎপাদন করা হয়।
তিনি বলেন, ত্রিপুরায় সমতল জমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম এবং বনাঞ্চল ও টিলা ভূমির পরিমাণ বেশি। সেই কারণে রাজ্যে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকরা নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন।
ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলার অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, এ বছর সিপাহিজলা জেলা ধান উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ ত্রিপুরা এবং গোমতী জেলাও ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সম্প্রতি খোয়াই জেলাও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ধলাই, ঊনকোটি, উত্তর এবং পশ্চিম জেলাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষিক্ষেত্রে অর্গানিক চাষের প্রসার সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে রাজ্যে মাত্র দুই হাজার হেক্টর জমিতে জৈব চাষ করা হতো। কিন্তু গত সাত বছরে তা বাড়িয়ে প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ হেক্টরে উন্নীত করা হয়েছে। ত্রিপুরার জৈব পণ্য বিদেশের বাজারেও চাহিদা তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। বিশেষ করে জার্মানিতে রাজ্যের অর্গানিক বার্ড আই চিলি, আদা, কালিখাশা চাল এবং হলুদের চাহিদা লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়াও রাজ্যে ন্যাচারাল ফার্মিং বা প্রাকৃতিক চাষের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫,৫৫০ হেক্টর জমিতে এই পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। কৃষিতে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অনেক যুবক নতুন উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন এবং তারা এর সরাসরি সুফলও পাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য রাজ্যস্তরে ১০ জন কৃষককে ৫০ হাজার টাকা করে পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া জেলা স্তরে ৮০ জন কৃষককে ২৫ হাজার টাকা করে সম্মানিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০০ জন কৃষককে ব্লক স্তরে ১০ হাজার টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
এদিনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলা পরিষদের সভাধিপতি সহ রাজ্য সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে কৃষি দপ্তরের সচিব অপূর্ব রায়, ডিরেক্টর ড. পি. বি. জামাতিয়া সহ অন্যান্য কর্মকর্তারাও অংশ নেন। কৃষকদের সম্মাননা প্রদান এবং কৃষিক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এই কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।