ত্রিপুরা চায় উন্নয়নের রাজনীতি কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার
“গায়ের জোর আর সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়ে রাজনীতি করা যায় না”—এমন বার্তা দিয়ে ফের কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। শনিবার মান্দাই মন্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত কার্যকর্তা সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি জানান, বর্তমান রাজ্য সরকার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলির সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করছে এবং রাজ্যকে “ভয়ের রাজনীতি”-র কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যেই ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিনিয়ত লড়ছে।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার সবসময় মনে হয়েছে, জনজাতিদের মতো সাহসী আর কেউ নয়। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ ও আত্মবিশ্বাস স্বাভাবিকভাবে রয়েছে।”
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সাহসের অর্থ হিংসা নয়—বরং সমাজের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া ও নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সমাজ সংস্কার, গান, নাচ, সংস্কৃতি, খেলাধুলা—সবক্ষেত্রেই জনজাতি সমাজের আলাদা ভূমিকা রয়েছে। তাই তাদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।”
ডাঃ সাহা বলেন, “রাজ্যে বহু বছর ধরে ভয়ের রাজনীতি কায়েম ছিল। এখন সেই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে হবে। ভারতীয় জনতা পার্টি রাজ্যকে সেই ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্ত করার জন্যই কাজ করছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “কমিউনিস্টরা যেখানে শাসন করেছে, সেখানে খুন, সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে—ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ কিংবা কেরালা—সব জায়গাতেই একই চিত্র দেখা গেছে।”
তবে তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ সালের পর গোটা দেশের রাজনৈতিক পরিভাষাই বদলে গেছে। “আজ ভারত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এখন গণতন্ত্রের যুগ, রাজতন্ত্র নয়। প্রত্যেক নাগরিকের রাজনীতি করার অধিকার আছে, যে কেউ দেশের যেকোন জায়গায় যেতে পারে। গায়ের জোর দিয়ে কতদিন চলবে?”
সম্প্রতি টাকারজলায় এক বৃদ্ধাকে আক্রমণের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “৭৫ বছর বয়সী এক মহিলার পায়ে দায়ের কোপ মারা হয়েছে—এটা কোন রাজনীতি নয়, এটা হিংসা। এই ধরণের ঘটনা কোন অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবে না।”
মুখ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ত্রিপুরা থেকে কমিউনিস্টদের উৎখাত করে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে। তিনি বলেন, “যে রাজ্যে কমিউনিস্টদের সরিয়ে আমরা সরকার গঠন করতে পেরেছি, সেখানে অন্য কোনো দল যদি গায়ের জোরে মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে, সরকার তা কোন অবস্থায় সহ্য করবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “রাজনীতি যদি রাজনীতির মতো করা যায়, তাহলে সহাবস্থান সম্ভব। কিন্তু রাজনীতির নামে কৌশল করে সরকারকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হলে আমরা তা বরদাস্ত করব না।
ডাঃ সাহা বলেন, “আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখানে জনজাতি মা-বোনদের উপস্থিতি বাড়ছে। তারা এখন অনেক বেশি সচেতন এবং উন্নয়নের রাজনীতির পাশে দাঁড়াচ্ছেন।”
তিনি আহ্বান জানান, “বিজেপিকে আরও শক্তিশালী করতে মা-বোনদের বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। রাজ্যের উন্নয়নের পথে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, অতীতে রাজ্যের সরকারগুলো মহারাজাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি। “আমরা এসে সেই সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছি, দেখিয়েছি কীভাবে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দেওয়া যায়,” বলেন তিনি।
মান্দাই মন্ডলের এই সম্মেলন উপলক্ষে নতুনভাবে ১০৯টি পরিবারের মোট ৩৩৯ জন ভোটার ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। মুখ্যমন্ত্রী সহ দলের অন্যান্য নেতারা তাদের দলে স্বাগত জানান।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য, প্রাক্তন সাংসদ রেবতী ত্রিপুরা, রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বিপিন দেববর্মা, সদর গ্রামীণ জেলার সভাপতি গৌরাঙ্গ ভৌমিক, মান্দাই মন্ডলের সভাপতি অভিজিৎ দেববর্মা সহ দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব।
সম্মেলনের শেষে মুখ্যমন্ত্রী ফের একবার সকলকে আশ্বস্ত করেন, “আমি আপনাদের অভয় দিচ্ছি, কোনো ভয় নেই। রাজ্যকে ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্ত করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “গায়ের জোর বা সাম্প্রদায়িক উস্কানির রাজনীতি নয়, আমরা চাই সহাবস্থান, উন্নয়ন এবং ঐক্যের রাজনীতি।”
ডাঃ মানিক সাহার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বিজেপি সরকার ত্রিপুরায় উন্নয়ন, ঐক্য ও ভয়মুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিশায় এগোতে চায়। তার ভাষণে জনজাতি সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও নারীশক্তির অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।