ভোটের আবহে উত্তপ্ত বাংলা, তার ওপর প্রকৃতির বাড়তি চাপ—দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহ আর উত্তরবঙ্গে বজ্রবৃষ্টির দ্বিমুখী চেহারায় এখন রাজ্যের আবহাওয়া কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা বাড়াচ্ছে প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষের।
কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় গরম ইতিমধ্যেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দিনের বেলায় রাস্তায় বের হওয়া কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, ২০ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে। পুরুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমান জেলায় তাপপ্রবাহের আশঙ্কা প্রবল, যেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে।এছাড়া বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বীরভূমে গরমের সঙ্গে আর্দ্রতার দাপট অস্বস্তি আরও বাড়াবে।
২১ ও ২২ এপ্রিল মূলত শুষ্ক আবহাওয়া থাকলেও, ২৩ থেকে ২৬ এপ্রিলের মধ্যে কিছু জেলায় হালকা বৃষ্টি বা বজ্র-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ২৬ এপ্রিল বজ্রবিদ্যুৎ এবং ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
এই তাপমাত্রা আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। কারণ, সামনে আসছে ‘সুপার এল নিনো’। সাধারণভাবে ‘এল নিনো’ হল প্রশান্ত মহাসাগরের এক বিশেষ আবহাওয়াগত পরিবর্তন, যেখানে পূর্ব ও মধ্য অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ বহু অঞ্চলে এর প্রভাবে তীব্র গরম ও শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়।যখন এই ‘এল নিনো’ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এই সুপার এল নিনোর প্রভাব দেখা যেতে পারে। তার জেরে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হবে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
কলকাতায় গ্রীষ্মে যেখানে তাপমাত্রা সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকে, সেখানে তা ৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ছয় থেকে সাতদিন উত্তরবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত চলবে। দার্জিলিং, কালিম্পং ও জলপাইগুড়িতে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
পাশাপাশি কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং দুই দিনাজপুরেও ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মালদহেও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে।এই বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরবঙ্গের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যা সেখানকার বাসিন্দা ও পর্যটকদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা থাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের দিন আবহাওয়ার ছবিটাও বেশ জটিল। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি ও বজ্রঝড় ভোট প্রক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের ভোটপ্রবণ জেলাগুলিতে যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমান এক-দু’জায়গায় বৃষ্টি হলেও তা বিচ্ছিন্নভাবে হবে। তবে গরম ও আর্দ্রতা ভোটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।সব মিলিয়ে, ভোটের মরশুমে বাংলার আবহাওয়া এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখে দক্ষিণে দাবদাহ, উত্তরে বৃষ্টির দাপট।
আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। ফলে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আবহাওয়ার এই চরম রূপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার প্রস্তুতি নিতে হবে।