ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ পরিষেবার ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ে পরিষেবা এখন আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নতুন সংযোগ, বিল পরিশোধ, অভিযোগ নিষ্পত্তি—সব ক্ষেত্রেই এসেছে বড়সড় পরিবর্তন।আগে যেখানে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হত, এখন সেই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণ অনলাইনে চলে এসেছে। বর্তমানে প্রায় ১০০ শতাংশ আবেদনই ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে এবং দ্রুততার সঙ্গে পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের সময় ও ভোগান্তি—দুটোই কমেছে। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে, যার ফলে গ্রাহকরা নিজেদের বিদ্যুৎ খরচ নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এবং বিল সংক্রান্ত বিভ্রান্তিও কমছে।মিটারিং, বিলিং এবং কালেকশন ব্যবস্থাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আগে যেখানে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতেন, এখন সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশে। অর্থাৎ, গ্রাহকরা দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রায় ৯৯ শতাংশ গ্রাহক এখন মোবাইল ফোনে বিল সংক্রান্ত আপডেট পাচ্ছেন, ফলে বিল হারিয়ে যাওয়া বা দেরিতে পাওয়ার সমস্যাও অনেকটাই কমেছে।পরিষেবার গতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মিটার পরিবর্তন। মিটার খারাপ হলে আগে তা বদলাতে দীর্ঘ সময় লাগত, কিন্তু এখন শহরাঞ্চলে গড়ে মাত্র ২.৯ দিনের মধ্যেই নতুন মিটার বসানো হচ্ছে। এই দ্রুততা পরিষেবার মানোন্নয়নের স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাতেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ২৪ ঘণ্টার কনজিউমার কেয়ার সেন্টার এখন সম্পূর্ণ সক্রিয়। ফলে গ্রাহকরা যেকোনো সময় সমস্যা জানাতে পারছেন এবং দ্রুত সমাধানও পাচ্ছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজের আগে থেকেই গ্রাহকদের সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে আগাম জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ত্রিপুরা ১০০ শতাংশ সাফল্য অর্জন করেছে, যা গত বছর ছিল মাত্র ১৪.৮ শতাংশ।এই সব উন্নয়ন একত্রে প্রমাণ করছে যে, ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিষেবা এখন শুধুমাত্র বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।জাতীয় স্তরেও এই অগ্রগতি স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের মোট ৬৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার মধ্যে মাত্র ৬টি সংস্থা ‘এ প্লাস’ গ্রেড অর্জন করেছে। ত্রিপুরাসহ মোট ২১টি সংস্থা ‘এ প্লাস’ বা তার কাছাকাছি উচ্চমানের ক্যাটাগরিতে জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া ২৭টি সংস্থা ‘বি প্লাস’, ১০টি ‘বি’, এবং খুব কম সংখ্যক সংস্থা ‘সি’ বা ‘সি প্লাস’ গ্রেড পেয়েছে। এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, ত্রিপুরা দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানকারী রাজ্যগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে।এই সাফল্যের পেছনে প্রশাসনিক নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী Ratan Lal Nath, বিদ্যুৎ সচিব Abhishek Singh এবং সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক Biswajit Basu-এর নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফলে এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রিপুরা এখন শুধু নিজেদের রাজ্যের মানুষকেই উন্নত বিদ্যুৎ পরিষেবা দিচ্ছে না, বরং গোটা দেশের সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করছে—কীভাবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তরিক প্রয়াসের মাধ্যমে একটি পরিষেবা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তোলা যায়।আগামী দিনে এই ধারা বজায় থাকলে, ত্রিপুরা খুব শিগগিরই দেশের সেরা বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানকারী রাজ্যগুলোর শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে পারে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।