ভারত আবারও এক নতুন প্রযুক্তিগত সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। দেশের রক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার আরেক বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)। রবিবার শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে প্রক্ষেপণ করা হবে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য তৈরি আধুনিক যোগাযোগ উপগ্রহ জি-স্যাট-৭আর (GSAT-7R)।ইসরোর তরফে জানানো হয়েছে, এই উপগ্রহটি সম্পূর্ণভাবে স্বদেশী প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজাইন ও নির্মিত। প্রায় ৪,৪০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহ এখন পর্যন্ত নৌবাহিনীর জন্য সবচেয়ে ভারী ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্বদেশী প্রযুক্তির শক্তিজি-স্যাট-৭আর, যাকে সিএমএস-০৩ (CMS-03)নামেও ডাকা হয়, তৈরি করা হয়েছে ভারতের নিজস্ব গবেষণা, নকশা ও উৎপাদন ক্ষমতার মাধ্যমে। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক মাল্টি-ব্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সপন্ডার, যা একযোগে শব্দ, তথ্য ও ভিডিও সংকেত আদান-প্রদান করতে সক্ষম।এর ফলে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ, সাবমেরিন, বিমান এবং অপারেশন সেন্টারগুলোর মধ্যে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হবে। এটি ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সমস্ত কৌশলগত এলাকায় বিস্তৃত কভারেজ প্রদান করবে।
কৌশলগত যোগাযোগে নতুন অধ্যায়নৌবাহিনীর আধিকারিকদের মতে, জি-স্যাট-৭আর প্রক্ষেপণ হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক অপারেশনস আরও শক্তিশালী হবে। সমুদ্রের দূরবর্তী অঞ্চলেও রিয়েল-টাইম ডেটা ট্রান্সমিশন, নজরদারি এবং সমন্বয় সম্ভব হবে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উপগ্রহ নৌবাহিনীর কার্যক্ষমতা শুধু বাড়াবে না, বরং ভারতের সামুদ্রিক সুরক্ষা বলয়কেও আরও সুসংগঠিত করবে। এর ফলে ভারতের সামুদ্রিক সীমান্তে নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
আত্মনির্ভর ভারতের বাস্তব রূপএই প্রকল্প “আত্মনির্ভর ভারত” এবং মেক ইন ইন্ডিয়া, উদ্যোগের এক বাস্তব প্রতিফলন। জি-স্যাট-৭আর-এর প্রতিটি অংশ, নকশা থেকে শুরু করে উপাদান পর্যন্ত, ভারতীয় গবেষক ও প্রকৌশলীদের দ্বারা তৈরি। এটি প্রমাণ করে যে, ভারত এখন নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষমতাকেই উন্নত করবে না, বরং ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে পৌঁছে দেবে।
আন্তর্জাতিক গুরুত্ববিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো ভারতও এখন মহাকাশ নির্ভর প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলির পর ভারতও নিজস্ব সামরিক যোগাযোগ স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছে।জি-স্যাট-৭আর প্রক্ষেপণের মাধ্যমে ভারত বিশ্ব মঞ্চে তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রমাণ আরও একবার তুলে ধরবে। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনাইসরো ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত উপগ্রহ যেমন জি-স্যাট-৭এসএবং পরবর্তী প্রতিরক্ষা যোগাযোগ স্যাটেলাইট সিরিজ তৈরি করা হবে।
এই পরিকল্পনার লক্ষ্য — তিন বাহিনীর (নৌ, স্থল ও বায়ু) জন্য একটি অভিন্ন মহাকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থা গঠন করা।এই সিস্টেম সম্পূর্ণ কার্যকর হলে, ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনী একক ও সমন্বিত নেটওয়ার্কে কাজ করতে পারবে, যা যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় বিরাট ভূমিকা রাখবে।
প্রতীকী সাফল্যজি-স্যাট-৭আর শুধু একটি উপগ্রহ নয়, এটি আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক। এটি দেখায়, ভারতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শক্তি কিভাবে একসঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।