আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনীতির দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উঠে আসবে ভারত—এমন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা বলেন, দেশের এই অগ্রযাত্রায় যুব ও ছাত্রছাত্রীরাই হবেন সবচেয়ে বড় শক্তি ও ভরসা। পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও সংখ্যালঘু ভাষার উন্নয়নে সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি ককবরক ভাষার নিজস্ব স্ক্রিপ্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
রবিবার আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে অনুষ্ঠিত অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এভিবিপি) আয়োজিত জনজাতি ছাত্রছাত্রী সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মুখ্যমন্ত্রী এই বক্তব্য রাখেন। বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, এই উৎসাহ ও অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে আগামী দিনে ত্রিপুরা আরও শক্তিশালী ও উন্নত রাজ্যে পরিণত হবে।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ এখানে এসে ছাত্রছাত্রীদের বিপুল উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনে এক শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গড়ে উঠবে। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি যুবসমাজ আমাদের ভবিষ্যৎ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ এই বয়সসীমার মধ্যে পড়ে। এই বিশাল শক্তির উপর ভর করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর করার স্বপ্ন দেখছেন।”
তিনি আরও বলেন, দেশের নিরাপত্তা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো গড়ে তোলা—সব ক্ষেত্রেই যুবসমাজকে সামনে রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা প্রয়াস, সবকা বিশ্বাস’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এগিয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। আজকের এই সম্মেলনেই তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যের শিক্ষা পরিবেশ ও ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট শাসনকালে স্কুল-কলেজে কখন কোথায় বোমা পড়বে, কেউ জানত না। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ছেড়ে তথাকথিত লাল বিপ্লবে নামতে বাধ্য করা হতো। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে।”
ডাঃ সাহা জানান, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশ এক স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী পথে এগোচ্ছে। আগে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চিত ও অস্থির, কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের পথে। প্রতি মাসের শেষ রবিবারে অনুষ্ঠিত ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং দেশ ও রাজ্যগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিশা নির্ধারণ করেন।
ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপ কমাতে ‘পরীক্ষা পে চর্চা’ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা যাতে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকে এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরীক্ষায় বসতে পারে, সেজন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রত্যেককে আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে। শুধু পড়াশোনার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, দেশের জন্য ভাবতে হবে, সমাজের জন্য কাজ করতে হবে।” তিনি স্বচ্ছ ভারত অভিযান, রক্তদান কর্মসূচি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি সহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, এইসব কাজের মাধ্যমে যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, তা অন্য কোথাও মেলে না।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ.আই.-এর গুরুত্ব প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ.আই. আমাদের অনেক কাজে সাহায্য করতে পারে এবং এবারের কেন্দ্রীয় বাজেটেও এই খাতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে প্রযুক্তির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের চিন্তাশক্তি ও জ্ঞানকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে ডাঃ সাহা বলেন, একসময় অর্থনীতির দিক থেকে ভারতের স্থান ছিল ১১ নম্বরে। সেখান থেকে পঞ্চম হয়ে বর্তমানে দেশ চতুর্থ স্থানে পৌঁছেছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে—এ নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই অগ্রযাত্রায় যুবসমাজের ভূমিকা অপরিসীম বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
ভাষা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় ভাষা ও সংখ্যালঘু ভাষার উন্নয়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে ককবরক ভাষার উন্নয়নের জন্য নিজস্ব স্ক্রিপ্ট তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে করে জনজাতি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় আরও সুদৃঢ় হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারবে।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী কিশোর বর্মন, প্রাক্তন সাংসদ রেবতী ত্রিপুরা, এভিবিপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কমলেশ সিং, সংগঠনের রাজ্য সভাপতি প্রফেসর ড. দেবরাজ পানিগ্রাহি, তীর্থরাম রিয়াং, রাজ্য সম্পাদক রবিশঙ্কর হালদার, অর্জুন ত্রিপুরা সহ অন্যান্য নেতৃত্ববৃন্দ। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত হয়ে দেশ ও সমাজ গঠনের কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে এগিয়ে চললেই গড়ে উঠবে এক শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ ভারত।