ছয় দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটলেও, সেই প্রতীক্ষা রামনগরে বয়ে আনল শুধু হৃদয়বিদারক শোক। বহিঃরাজ্যে চিকিৎসাশাস্ত্রে ইন্টার্নশিপরত ত্রিপুরার তরুণ ডাক্তারি পড়ুয়া সপ্তর্ষি দাসের নিথর দেহ অবশেষে সোমবার সকালে তার বাড়িতে পৌঁছায়। উত্তরপ্রদেশের আমরোহায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিন বন্ধুর সঙ্গে প্রাণ হারান তিনি। বিমানযোগে মরদেহ আনতে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হওয়ায় পরিবারকে ছয় দিন ধরে অসহ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়।
রামনগর ১ নং রোডের বাসিন্দা সপ্তর্ষি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, যাকে ঘিরেই তাদের ভবিষ্যৎ, আশা আর নির্ভরতা। মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা প্রায় শেষ পর্যায়ে, সামনে ছিল উজ্জ্বল সম্ভাবনা। কিন্তু এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা ছিন্নভিন্ন করে দিল সেই স্বপ্ন। ছেলের জন্য গর্বিত বাবা-মা আজ শোকে বাকরুদ্ধ; ভাগ্যের কাছে পরাস্ত এই পরিবার ছেলের মুখ শেষবার ছুঁতেও পারল না কফিন সিল থাকার কারণে।
বাড়ির সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমতে থাকে প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজন ও পরিচিতদের। এলাকাজুড়ে পরিবেশ নেমে আসে শোকের ভারে। শান্ত রাস্তাগুলো হঠাৎই ভরে ওঠে কান্নার শব্দে। শোকস্তব্ধ মানুষের ভিড় কফিন পৌঁছানোর মুহূর্তে একসঙ্গে গলে যায় নিস্তব্ধ আর্তনাদে।
এই দুর্ঘটনায় রাজ্যের চিকিৎসা মহলেও নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তরুণ চার চিকিৎসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু গোটা সমাজকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের প্রত্যেকের পরিবারই ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ছিল—আজ সবাইকে তা মেনে নিতে হচ্ছে অকল্পনীয় বাস্তব।
সপ্তর্ষির মরদেহ পৌঁছানোর পর মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ মানিক সাহা, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশীষ কুমার সাহা, বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন, মেয়র দীপক মজুমদারসহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। মুখ্যমন্ত্রী জানান, “এমন দুঃসংবাদের ভাষা নেই। পরিবারকে এই শোক সামলানোর শক্তি ভগবান দিন। মরদেহ দ্রুত ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু বিমান সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে।” তিনি মৃত আত্মার শান্তি কামনাও করেন।
ছয় দিনের অপেক্ষা শুধু সময়ের হিসেব নয়—এ ছিল এক অসহায় পরিবারের গভীর যন্ত্রণা, যার পরিসমাপ্তি ঘটল প্রিয় ছেলেকে কফিনবন্দি অবস্থায় বাড়ি ফেরানোর মাধ্যমে। কিন্তু এই ফিরে আসা কোনো আনন্দ নয়, বরং এক অপূরণীয় ক্ষতির সাক্ষ্য।
সপ্তর্ষির আকস্মিক প্রস্থান মনে করিয়ে দিল—একটি দুর্ঘটনা কত সহজেই থামিয়ে দিতে পারে এক পূর্ণ সম্ভাবনাময় জীবনকে। রামনগর আজ কাঁদছে এক তরুণ চিকিৎসকের অসমাপ্ত স্বপ্ন, স্তব্ধ হয়ে আছে এক পরিবার, আর শোকাতুর রাজ্য মনে রেখেছে তার নাম—সপ্তর্ষি দাস।