ত্রিপুরার উত্তরাঞ্চলের কৃষি মানচিত্রে আজ যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। কাঞ্চনপুরে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ কৃষি কর্মসূচিতে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী রতন লাল নাথ আধুনিক এআরসি (অটোমেটিক রিজ কাল্টিভেশন) পদ্ধতিতে আলু রোপণের প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিজেও রোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এই কর্মসূচি সম্পন্ন হয় আলু চাষি জ্যোতির্ময় দাস ও ধনঞ্জয় দাসের জমিতে, যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।মন্ত্রী রোপণ উত্তরণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, কৃষক ও জমির সম্পর্ক শুধু উৎপাদনের নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মাটির গভীর বন্ধন। তিনি আরও জানান যে সুভাষ নগর ও ডাইনছড়া ভিলেজ কাউন্সিলের কর্ণজয় পাড়ায় এই উদ্যোগে যোগ দিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন, প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে কৃষিকাজ কতটা আধুনিক ও লাভজনক হতে পারে।
এআরসি পদ্ধতি সম্পর্কে মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আশাবাদী—“এটি শুধুই এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি আমাদের আলু চাষিদের কাছে নতুন আত্মবিশ্বাসের গল্প।”তার মতে, কৃষক যদি সমৃদ্ধ হয়, রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হয়। তাই কৃষককে ক্ষমতায়ন করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।বর্তমানে ত্রিপুরাজুড়ে প্রায় ২৩,৭০০ কৃষক প্রায় ৪৭,৩৪১ কানি জমিতে আলু চাষ করেন। বহু বছর ধরে প্রথাগত পদ্ধতিতে প্রতি কানিতে ২,৫০০–৩,০০০ কেজি আলু উৎপাদনকে সাধারণ মানদণ্ড হিসেবে ধরা হতো।
কিন্তু এআরসি প্রযুক্তির ব্যবহার সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে।মন্ত্রী রতন লাল নাথ জানান, এআরসি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়ে প্রতি কানিতে এখন ৯,০০০ থেকে ১০,০০০ কেজি পর্যন্ত পৌঁছেছে—যা ত্রিপুরার আলু চাষের ক্ষেত্রে সত্যিকারের এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।এআরসি পদ্ধতির সাফল্যকে বাস্তবে রূপ দিতে কাঞ্চনপুরে ইতিমধ্যেই ৫৫ জন কৃষককে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের আশা, এই সফল উদ্যোগ রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চল—বিশেষ করে করবুকসহ দক্ষিণাঞ্চল—পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।মন্ত্রী বলেন, নতুন প্রযুক্তি কৃষকের শ্রম কমাবে, ব্যয় হ্রাস করবে এবং কম সময়ে অধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ করে দেবে। ফলে কৃষিকাজ তরুণ প্রজন্মের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
ত্রিপুরা সরকার কৃষি খাতে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। মন্ত্রী জানান— ২০২৮–২৯ অর্থবছরের মধ্যে ত্রিপুরাকে বীজ আলু উৎপাদনে স্বনির্ভর করা হবে। ২০২৯–৩০ সাল নাগাদ সম্পূর্ণ আলু উৎপাদনে রাজ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।এই লক্ষ্য অর্জিত হলে রাজ্যের আলুর ওপর বহির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং কৃষকরা পাবেন আরও লাভজনক বাজার।মন্ত্রী রতন লাল নাথের মতে, কাঞ্চনপুরে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তি প্রয়োগ নয়; এটি ত্রিপুরার কৃষি খাতে নতুন পরিবর্তনের প্রতীক। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে এআরসি প্রযুক্তি দ্রুতই সমগ্র রাজ্যে বিস্তার লাভ করবে এবং আলু উৎপাদনের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
এদিনের কর্মসূচি কৃষকদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মাঠজুড়ে কৃষকদের উৎসাহ, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং সরকারের দিকনির্দেশনা একসাথে রাজ্যের কৃষি উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কৃষকদের বক্তব্যেও ছিল আশার কথাই—এই প্রযুক্তি তাদের পরিশ্রম কমাবে, উৎপাদন বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে বাজারে ভালো দামে বিক্রির সম্ভাবনা তৈরি করবে।কাঞ্চনপুরের এআরসি-ভিত্তিক আলু রোপণ কর্মসূচি ত্রিপুরার কৃষি উন্নয়নের জার্নিতে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষকের এক সুদৃঢ় অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে, যা আগামী দিনে রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।