ত্রিপুরা রাজ্যের জনজাতি সমাজের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান রাজ্য সরকার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহার নেতৃত্বে এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পথও তৈরি করছে।আজ রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে জনজাতি অংশের মহিলাদের হাতে রিয়া ও পাছরা বোনার সুতা তুলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকারের এই প্রতিশ্রুতির পুনর্নিশ্চয়তা দেন।
হস্ততাঁত, হস্তকারু ও রেশম শিল্প দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিরা ২৫ জন মহিলার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সুতা তুলে দেন।এই কর্মসূচির আওতায় আজ মোট ২ হাজার জনজাতি মহিলাকে সুতা প্রদান করা হয়। চলতি অর্থবছরে “চিফ মিনিস্টার ট্রাইবেল উইমেন উইভার্স ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম”-এর অধীনে সারা রাজ্যে ২০ হাজার জনজাতি মহিলাকে সুতা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য: ‘জনজাতি উন্নয়ন এখন সরকারের মূল অঙ্গীকার’অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, “নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সারা দেশে জনজাতিদের উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষ আজ উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছেন।”মুখ্যমন্ত্রী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘ধরতি আবা জনজাতি গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান’–এর কথা, যা জনজাতি গ্রামগুলোর উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি গর্বের সঙ্গে জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য ত্রিপুরা ইতিমধ্যেই তিনটি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে।তিনি আরও বলেন, “জনজাতি অধ্যুষিত ব্লক এলাকাগুলিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্য সরকার ১৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই আমাদের অগ্রাধিকার।”
আদিবাসী সমাজের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার ত্রিপুরার অন্যতম আদি জনজাতি গোষ্ঠী *রিয়াং বা ব্রু* সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সরকার গত এক বছরে ৩২২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমাদের রাজ্যে ১৯টি প্রধান জনজাতি গোষ্ঠী রয়েছে, তবে সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে উপ-গোষ্ঠীগুলোর প্রতিও।”মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার একেবারে জনজাতি-বান্ধব সরকার হিসেবে কাজ করছে। সমাজপতিদের ভাতা বৃদ্ধি করে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে এবং জনজাতি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির বিকাশে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।এছাড়া *জনজাতি বিকাশ যোজনা* প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই ৯,৩২৫ জন জনজাতি নাগরিককে ২৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ত্রিপুরার জনজাতি নারীদের ঐতিহ্যবাহী হস্তবুনন শিল্প এখন রাজ্যসীমা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিতি পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “জনজাতি নারীদের তৈরি রিয়া ও পাছরা এখন অন্যান্য রাজ্যে রপ্তানি হচ্ছে। এটা শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, আমাদের সংস্কৃতির মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতীক।”তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চাই রাজ্যের জাতি ও জনজাতি সমাজ একসাথে হাতে হাত রেখে কাজ করুক। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমেই ত্রিপুরা আরও সমৃদ্ধ হবে।”মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে আহ্বান জানান— সর্বত্র শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নেশামুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা** বলেন, “জনজাতি মহিলাদের সশক্তিকরণে রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যেই অনেক মহিলা আত্মনির্ভর হয়েছেন এবং নিজস্ব হস্তশিল্পের মাধ্যমে সমাজে উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
”তিনি আরও বলেন, “নিজের উন্নয়নের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী সমাজ গড়তে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সরকারের পাশে থেকে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, যিনি বক্তব্যে বলেন, “রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেই নয়, বরং সামাজিক সম্মানের ক্ষেত্রেও এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।
”হস্ততাঁত, হস্তকারু ও রেশম শিল্প দপ্তরের অধিকর্তা স্বাগত বক্তব্যে জানান, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনজাতি মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ত্রিপুরায় জনজাতি উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে একাধিক দপ্তরের মাধ্যমে শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো থেকে উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রতিটি ক্ষেত্রে জনজাতিদের সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রকল্প কেবল অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয় না, বরং সমাজে আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসও জাগিয়ে তোলে। বিশেষত মহিলাদের হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তুলে দেওয়ায় গ্রামীণ ত্রিপুরার আর্থসামাজিক কাঠামোয় এক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজ্য সরকার জনজাতি সংস্কৃতি সংরক্ষণেও সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব, নৃত্য ও সংগীত কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পীদের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসাথে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও বয়ন সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
আজকের এই সুতা প্রদান অনুষ্ঠানটি কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং ত্রিপুরার সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ও তাঁর মন্ত্রিসভার প্রচেষ্টায় রাজ্যের জনজাতি অংশের মানুষ আজ নতুন উদ্যমে নিজেদের উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছেন।