উত্তর ত্রিপুরার কদমতলা থানাধীন পত্যেকরায় গ্রামে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল। ইলেকট্রিক টমটমের ব্যাটারি চুরির অভিযোগে ধৃত এক ব্যক্তিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুরুতরভাবে আহত হলেন দুই পুলিশ আধিকারিক এবং ১৩ নম্বর টিএসআর ব্যাটেলিয়নের তিন জওয়ান। আহত হয় ধৃত চোরও। বর্তমানে গোটা এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিট নাগাদ পত্যেকরায় গ্রাম পঞ্চায়েতের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এসসি বয়েজ হোস্টেল সংলগ্ন এলাকায় বাসিন্দা সুমন দেবনাথের বাড়ির সামনে রাখা একটি ব্যাটারি চালিত টমটম থেকে ব্যাটারি চুরির চেষ্টা চালায় দুই দুষ্কৃতী। বিষয়টি নজরে আসে তাঁর ছেলে অলক দেবনাথের। তিনি চিৎকার করে প্রতিবেশীদের সতর্ক করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরিস্থিতি বুঝে এক দুষ্কৃতী পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অপরজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন স্থানীয়রা।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কদমতলা থানার পুলিশ। পুলিশ ধৃত ব্যক্তিকে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য থানায় নিয়ে যেতে চাইলে উত্তেজিত গ্রামবাসীদের একাংশ তাতে বাধা দেয়। তাঁদের অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই টমটমের ব্যাটারি চুরির ঘটনা ঘটছে। বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। সেই ক্ষোভ থেকেই ধৃত ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘শাস্তি’ দেওয়ার দাবি ওঠে।
এই দাবি ঘিরেই শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতার একাংশ পুলিশের উপর চড়াও হয়। ধৃত ব্যক্তিকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। হামলায় গুরুতর জখম হন কদমতলা থানার সাব-ইন্সপেক্টর সঞ্জিব সরকার। তাঁর মাথায় আঘাত লেগে রক্তক্ষরণ হয় এবং তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত হন একই থানার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর জগদানন্দ গোস্বামীও।
এছাড়াও ১৩ নম্বর টিএসআর ব্যাটেলিয়নের তিন জওয়ান—নিপেন্দ্র রিয়াং, অসিত লাল দাস ও তনু সিং ত্রিপুরা—সংঘর্ষে আহত হন। পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত পুলিশ ও টিএসআর বাহিনী মোতায়েন করা হয় এলাকায়।
ধৃত চোরের নাম কবির হোসেন (২৮)। তাঁর বাড়ি চুরাইবাড়ি থানাধীন উত্তর ফুলবাড়ি ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গণপ্রহারে তিনিও গুরুতর জখম হন। প্রথমে তাঁকে কদমতলা সামাজিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরবর্তীতে ধর্মনগর জেলা হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ টহল জোরদার করেছে। ধর্মনগর মহকুমা পুলিশ আধিকারিক জয়ন্ত কর্মকার ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে ইতিমধ্যে অলক দেবনাথ, রাহুল দেবনাথ এবং সুমন দেবনাথ নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলা-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। কদমতলা থানার অফিসার ইনচার্জ গুরুপদ দেবনাথ জানিয়েছেন, এই ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোটা ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট নম্বরের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই ঘটনায় একদিকে যেমন এলাকায় চুরির পুনরাবৃত্তি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের তরফে শান্তি ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় উত্তেজনা সম্পূর্ণ প্রশমিত হয়নি। তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সকলের।