ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে একলব্য বিদ্যালয়ের উদ্বোধন!
বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার জম্পুইজলা জেলার প্রভাপুরে ৪৮০ আসন বিশিষ্ট একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয়ের শুভ উদ্বোধন সম্পন্ন হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা নিজে উপস্থিত থেকে বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত অতিথি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যালয় নির্মাণে ব্যয় হয়েছে মোট ২৮.৫৪ কোটি টাকা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সকলের উন্নয়নই আমাদের সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের অন্তিম মানুষটির কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন, আমরাও সেই নীতিতে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের সূচকে ত্রিপুরা এখন ফ্রন্ট রানার স্টেট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা ও অবকাঠামো উন্নয়নে গত কয়েক বছরে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা দেশজুড়ে নজর কেড়েছে।
ত্রিপুরা সম্প্রতি দেশের তৃতীয় পূর্ণ স্বাক্ষর রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে এই সাফল্যের কথাও। তিনি জানান, “রাজ্যে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৯৫.৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আমাদের শিক্ষানুরাগ ও অগ্রগতির প্রতিফলন।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় ভারতবর্ষ ছিল জ্ঞানের তীর্থভূমি—নালন্দা ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য আজও প্রেরণা জোগায়। সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় প্রকল্পের মাধ্যমে আদিবাসী ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের বাজেটে এই বছর ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে জনজাতি লোকসংগীত, লোকনৃত্য, হস্তশিল্প, হস্তকারু ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার বিকাশের জন্য কর্মশালা, শিক্ষা সফর ও মেলার আয়োজন করতে। তাঁর মতে, “এই উদ্যোগ কেবল সংস্কৃতির সংরক্ষণ নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করবে।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, রাজ্যে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট তিনটি নতুন এসটি হোস্টেল এবং ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সাতটি নতুন এসটি হোস্টেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের আবাসন সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিনি উল্লেখ করেন, “একসময় ত্রিপুরার ছাত্রছাত্রীরা উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর উচ্চশিক্ষার জন্য রাজ্যের বাইরে যেতে বাধ্য হত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।” বর্তমানে রাজ্যে এমবিবিএসের ৪০০টি আসন রয়েছে, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে রয়েছে প্রায় ৭৯টি আসন। তাছাড়া রাজ্যে সরকারি ডেন্টাল কলেজে ৬৩টি আসন ও নার্সিং কলেজও চালু হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকার ত্রিপুরাকে “মেডিক্যাল হাব” হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো, দক্ষ ডাক্তার তৈরির উদ্যোগ এবং মেডিক্যাল শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে রাজ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চলেছে।
আইন-শৃঙ্খলার উন্নতির ফলে বহিঃরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা এখন ত্রিপুরায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আমাদের রাজ্যকে বিনিয়োগবান্ধব রাজ্যে পরিণত করেছে। ইতিমধ্যে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিপুরায় আসছে।”
প্রভাপুরে নবনির্মিত একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয়ে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভবন, দুটি রান্নাঘর, বৃহৎ ডাইনিং হল, হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট ও প্রধান শিক্ষকের কোয়ার্টারসহ প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলিতেও রয়েছে ডিজিটাল সুবিধা ও স্মার্ট ক্লাসরুম ব্যবস্থা।
অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষ পরিদর্শন করেন এবং ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। শিক্ষার্থীরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা, বিধায়ক মানব দেববর্মা, প্রাক্তন বিধায়ক বীরেন্দ্র কিশোর দেববর্মা, জেলাশাসক ডাঃ সিদ্ধার্থ শিব জয়সওয়ালসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি আরও বর্ণময় হয়ে ওঠে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী যে বার্তা দেন তা স্পষ্ট—ত্রিপুরার উন্নয়নের মূলভিত্তি হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শান্তি। একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের প্রত্যন্ত ও জনজাতি এলাকাগুলিতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
এই বিদ্যালয়গুলি শুধু পাঠদান নয়, বরং সমাজের অন্তিম প্রান্তের শিশুদের আত্মনির্ভর করে তোলার প্রতিশ্রুতি বহন করছে। সংস্কৃতি ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই উদ্যোগ এক নতুন প্রজন্মকে আত্মবিশ্বাস ও গৌরবে ভরিয়ে তুলবে—এমনটাই আশা রাজ্যের প্রশাসনের।