উত্তরবঙ্গে ত্রাণ নয়, রাজনীতি! হামলার শিকার বিজেপি বিধায়ক
উত্তরবঙ্গের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে হামলার শিকার হলেন বিজেপি বিধায়ক মনোজ কুমার ওরাঁও। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার বিকেলে জলপাইগুড়ির নাগরকাটা এলাকায়। এই ঘটনার জেরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশেষ করে যখন মাত্র একদিন আগেই একই এলাকায় বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু ও বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়েছিল।
বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, মনোজ ওরাঁও সোমবার নাগরকাটার বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিদর্শনে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎই একটি দল তাঁর গাড়ির উপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ। তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর হয়। আহত অবস্থায় বিধায়ককে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতাল থেকে মনোজ ওরাঁও বলেন, “আমি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটি সংগঠিত দল আমাকে ঘিরে ধরে আক্রমণ করে। এই হচ্ছে তৃণমূল শাসিত বাংলার গণতন্ত্রের অবস্থা। মানুষের পাশে দাঁড়ালেই আক্রমণের শিকার হতে হয়।”
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঘটনার পেছনে বিজেপিরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজ করছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতা বলেন, “মনোজ ওরাঁও প্রথমে একজন বয়স্ক মানুষকে মারধর করেন। এর পরেই স্থানীয় মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এটি রাজনৈতিক হামলা নয়, বরং উস্কানির ফল।”
তৃণমূল আরও অভিযোগ করে যে বিজেপি দুর্যোগকালীন সময়েও রাজনীতি করছে এবং বন্যা পরিস্থিতিকে “রাজনৈতিক প্রচারের উপকরণ” হিসেবে ব্যবহার করছে।
ঘটনার পরপরই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি তীব্র প্রতিবাদ জানায়। দলীয় তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “উত্তরবঙ্গে যারা বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যান, তাদের ওপর তৃণমূল হামলা চালায়। এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের প্রকৃত চিত্র। বাংলায় এখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই অপরাধ।”
দলটি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায়, আহত বিধায়ক মনোজ ওরাঁওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাঁর ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলি রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে। বিজেপির দাবি, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা নিচ্ছে।
আরও এক বিবৃতিতে বিজেপি জানায়, “তৃণমূলের কাছে মানবতা বলে কিছু নেই। তারা কেবল সন্ত্রাস, মিথ্যা ও ঘৃণার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। উত্তরবঙ্গের মানুষ যখন বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত, তখনও তৃণমূল সহিংসতা ছড়াচ্ছে।”
ঘটনাটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সাংসদ ও বিধায়কদের উপর এই ধরনের হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার করুণ চিত্র তুলে ধরে। রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে মনোনিবেশ করতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী আরও নির্দেশ দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি যাতে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেয়।
এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, “ওনার ব্লাড সুগার বেড়ে গিয়েছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছি।”
তবে রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই সাক্ষাৎ আসলে রাজ্য প্রশাসনের ‘damage control’ পদক্ষেপ। কারণ, টানা দুই দিনে বিজেপি নেতাদের উপর হামলার অভিযোগ রাজ্য সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উত্তরবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রবল বর্ষণে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সেনা, এনডিআরএফ ও রাজ্য প্রশাসনের যৌথ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চলছে।
তবে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট দ্রুতগতিতে চলছে না এবং অনেক এলাকায় এখনও প্রশাসনের উপস্থিতি নেই। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের স্থানীয় নেতারা নিজের উদ্যোগে খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন, কিন্তু সেখানে “তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা বাধা দিচ্ছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতির স্পর্শকাতর এলাকা। এখানে বিজেপির প্রভাব তুলনামূলক বেশি এবং প্রতিটি নির্বাচনে এই অঞ্চলই বড় ভূমিকা রাখে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও রাজনৈতিক সংঘাত মাথাচাড়া দিচ্ছে তা অবাক হওয়ার নয়।
কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনির্বাণ দে বলেন, “উত্তরবঙ্গের প্রতিটি ঘটনার পেছনে এখন নির্বাচনী সমীকরণ কাজ করছে। একদিকে বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলার অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে তৃণমূল বলছে বিজেপি দুর্যোগকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক প্রচারের জন্য। উভয় পক্ষই মূলত নিজেদের সমর্থনভিত্তি শক্ত করতে চাইছে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট, উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে। তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েই মাঠে নেমে পড়েছে — একদিকে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব, অন্যদিকে রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুততর করা। কারণ, যদি রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে থাকে, তবে দুর্যোগ মোকাবিলার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
মনোজ ওরাঁওয়ের উপর হামলার ঘটনাটি নিছক একটি রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং এটি রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও যখন রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে — সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কি তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে?
উত্তরবঙ্গের বন্যা পরবর্তী এই অস্থিরতা সামলানো এখন রাজ্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, এবং আগামি দিনে এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা সময়ই বলবে।