ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি) নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তিপ্রা মথার প্রার্থী তালিকা ঘোষণাকে ঘিরে দলীয় অন্দরে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন দলপ্রধান প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মন। বর্তমান এমডিসি-দের একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে নতুন মুখ তুলে আনার কৌশল গ্রহণ করা হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই দলের ভেতরে অসন্তোষের জন্ম দেয়।
এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই মঙ্গলবার দিনভর দলীয় অন্দরে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি চরমে ওঠে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে, নির্ধারিত সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি দল। বরং, একাধিক ক্ষেত্রে দেখা যায়—ঘোষণার আগেই দলের কিছু নেতা নিজেদের সমর্থকদের নিয়ে মিছিল করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে শুরু করেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি দলীয় শৃঙ্খলার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবকেই সামনে এনেছে।সূত্রের দাবি, এই বাড়ন্ত চাপের মুখে শেষ মুহূর্তে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম অনুমোদন করতে বাধ্য হন দলপ্রধান। ফলে প্রার্থী তালিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অসন্তোষ আরও বাড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় কারণ হল বিজেপির আগাম অবস্থান।
বিজেপি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা নির্বাচনের আগে কোনও মিত্র দলের সঙ্গে জোটে যেতে আগ্রহী নয়। এর পরেই তিপ্রা মথা ২৮টি আসনেই এককভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।প্রকাশিত প্রার্থী তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক হল—দলপ্রধান প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মন নিজেই প্রার্থী নন।
গত নির্বাচনে তিনি টাকারজলা-জাম্পুইজলা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এবার সেই আসনে দলের যুব সংগঠনের সভাপতি সুরজ দেববর্মাকে প্রার্থী করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তালিকার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫০ শতাংশ বর্তমান এমডিসি-কে বাদ দিয়ে নতুনদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি একাধিক নির্বাহী সদস্যকেও এবার টিকিট দেওয়া হয়নি। উল্লেখযোগ্যভাবে, রাজেশ ত্রিপুরা এবং সুহেল দেববর্মার মতো পরিচিত মুখদের বাদ পড়া দলীয় অন্দরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ‘মহারানি-চেলাগং’ কেন্দ্র থেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা চন্দ্রকুমার জামাতিয়াকে প্রার্থী করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে দলীয় কৌশলে নতুনত্ব আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের রাজনীতিতে নিয়ে এসে দল সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে।তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন দলের নির্বাহী সদস্য ডলি রিয়াং।
তাঁকে প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি নাকি বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। দলীয় এক প্রবীণ নেতা দাবি করেছেন, বিজেপি তাঁকে টিকিট না দেওয়ায় তিপ্রা মথাও শেষপর্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
এই অস্থিরতার মধ্যেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। সিইএম পূর্ণচন্দ্র জামাতিয়া এবং চেয়ারম্যান জগদীশ দেববর্মা তাঁদের নিজ নিজ আসনে পুনরায় প্রার্থী হয়েছেন।
পাশাপাশি, প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন বিধায়ক রাজেশ্বর দেববর্মাকেও কুলাই-চাম্পাহাওর কেন্দ্র থেকে টিকিট দেওয়া হয়েছে।সব মিলিয়ে, তিপ্রা মথার এই প্রার্থী তালিকা যেমন নতুন মুখের উত্থানকে সামনে এনেছে, তেমনই দলীয় অন্দরের অসন্তোষ ও সমন্বয়হীনতার চিত্রও স্পষ্ট করেছে। আসন্ন নির্বাচনে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা এখন সময়ই বলবে।