যাত্রাপুর থানার অন্তর্গত কালীখলা এডিসি ভিলেজের একটি ইটভাটায় এক তরুণী মহিলা শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে ভাটার শ্রমিক আবাসন থেকে উদ্ধার হয় ২২ বছর বয়সী স্বপ্না টিক্কার ঝুলন্ত দেহ। ঘটনায় শোকস্তব্ধ সহকর্মীরা, পাশাপাশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়েছে আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃতার নাম স্বপ্না টিক্কা (২২)। তিনি স্বামী জগন্নাথ কুজূর (২৪)-এর সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি থেকে কয়েক মাস আগে কাজের সন্ধানে এই ইটভাটায় আসেন। দম্পতি দু’জনেই ভাটায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালীখলার ‘বি এম আই’ নামের ওই ইটভাটায় মোট ৮৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৫২ জনই রাঁচি থেকে আসা পুরুষ ও মহিলা শ্রমিক। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার ভোরেও শ্রমিকরা কাজে বেরিয়ে পড়েন। তবে স্বপ্না কাজে না আসায় প্রথমে সহকর্মীদের সন্দেহ হয়।
ইটভাটার ম্যানেজার সঞ্জয় নাহা জানান,
“ভোরে সবাই কাজে বেরোলেও ওই মহিলা বেরোয়নি। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে অন্য মহিলারা খোঁজ নিতে যান। তখন দেখা যায় ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।”
এরপর সহকর্মীরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখেন, তা তাঁদের স্তম্ভিত করে দেয়। ঘরের চালের লোহার রডে সাদা নাইলনের দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় স্বপ্নার দেহ।
এই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মহিলা শ্রমিকরা। চিৎকার শুনে অন্যরাও ছুটে আসেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভাটায় ছড়িয়ে পড়ে শোক ও উত্তেজনা।
ঘটনার খবর সঙ্গে সঙ্গে ভাটার ম্যানেজার ও মালিকপক্ষ যাত্রাপুর থানায় জানান। সকাল প্রায় আটটা নাগাদ পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। দেহ উদ্ধার করে কাঠালিয়া সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ভাটার মালিকদের মধ্যে রয়েছেন এমডি কামাল হোসেন, রাজেশ দেবনাথ এবং নজরুল ইসলাম। তাঁরা জানান, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পুলিশ তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।
তবে এই ঘটনাকে ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
সহকর্মীদের একাংশের দাবি, স্বপ্না মানসিকভাবে খুব চাপে ছিলেন কি না, তা জানা নেই। আবার কেউ কেউ বলছেন, কাজের চাপ, দূর রাজ্য থেকে এসে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস— এসব কারণেও শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আমরা সকলে একসঙ্গে থাকি, কাজ করি। এমন ঘটনা কখনও দেখিনি। খুব ভয় লাগছে। কীভাবে কী হলো, বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রাপুর থানা এলাকায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। ফলে নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত এটিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই নথিভুক্ত করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু— সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্বপ্নার আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর স্বামী জগন্নাথ কুজূর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। সহকর্মীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দূর রাজ্য থেকে কাজের সন্ধানে এসে এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
ঘটনার পর থেকে ভাটায় কাজকর্ম কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক স্পষ্ট। প্রশাসনের তরফে দ্রুত তদন্ত করে সত্য সামনে আনার দাবি উঠেছে।
এই ঘটনা আবারও তুলে ধরল— পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন কতটা অনিশ্চিত, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। কাজের খোঁজে বাড়ি ছেড়ে আসা মানুষগুলোর নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার দায়িত্ব কে নেবে— সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কালীখলার বাতাসে।