ত্রিপুরায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় সাফল্যের দাবি করল রাজ্য পুলিশ। বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) জানান, ২০২৫ সালে ত্রিপুরায় অপরাধের হার গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে রাজ্যে সামগ্রিক অপরাধের হার কমেছে ৮.৩ শতাংশ।ডিজিপি জানান, ২০২৫ সালে রাজ্যে মোট ৩,৬৯৮টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪,০৩৩। এই পরিসংখ্যান রাজ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার প্রতিফলন বলেই মন্তব্য করেন তিনি।সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ ও খুনের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাসবিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরে ডিজিপি জানান, ২০২৫ সালে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরে এ ধরনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে ২৯৩টি, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪৯টি। অর্থাৎ, এক বছরে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ কমেছে ১৬.০৪ শতাংশ।খুনের ঘটনাতেও কমতির প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে যেখানে খুনের ঘটনা ছিল ১১৬টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫টিতে। শতাংশের হিসেবে যা ১৮.১০ শতাংশ হ্রাস।এছাড়াও আঘাত ও হামলার ঘটনায় ১৪.২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের মামলা হয়েছে ৬৯৯টি, যেখানে আগের বছর ছিল ৮১৫টি। দাঙ্গার ঘটনাতেও কমতি এসেছে—২০২৪ সালে ২৩টি দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১৭টি।নারীর বিরুদ্ধে অপরাধেও কমতিরাজ্যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে বলে জানান ডিজিপি। ২০২৪ সালে যেখানে এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল ৭২৪টি, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬৫টিতে। পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয় নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।সড়ক দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতিসড়ক নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা তুলে ধরেন রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক। তিনি জানান, বিশেষ অভিযান ও কড়া নজরদারির ফলে ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৮.৮ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে রাজ্যে মোট ৫৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৫২০টি।মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমেছে ১৪.৫৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে মারাত্মক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২১৩টি, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮২টিতে।ডিজিপি আরও জানান, সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় ত্রিপুরায় সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কম। ২০২৩ সালে দেশে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় দুর্ঘটনার হার ছিল ৩৪.৬টি, যেখানে ত্রিপুরায় এই হার ছিল মাত্র ১৩.৯। ২০২৫ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৩৫-এ।উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, একই সময়ে রাজ্যে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৮.১১ লক্ষ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮.৬৭ লক্ষ।মাদক ও আর্থিক অপরাধ দমনে জোরদার অভিযানমাদক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন ডিজিপি। তিনি জানান, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় গাঁজা জব্দের পরিমাণ বেড়েছে ১৪ শতাংশ। কাশির সিরাপ জব্দ বেড়েছে ১৪৫ শতাংশ এবং বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট জব্দ বেড়েছে ২৬.৩৭ শতাংশ। পাশাপাশি, ৯৫ শতাংশ বেশি গাঁজা গাছ ধ্বংস করা হয়েছে।আর্থিক অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। ডিজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজ্যে মোট ১,৬৩৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই অঙ্ক ছিল ৮৪৯ কোটি টাকা।এছাড়া পুলিশের প্রয়োগ ও অপরাধ সনাক্তকরণের হার ২০২৫ সালে প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও জানান তিনি।পুলিশের দাবি—কার্যকর প্রশাসনের ফলেই সাফল্যসব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে ত্রিপুরায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার ফলেই গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অপরাধের হার অর্জন করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক। আগামী দিনেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে পুলিশ প্রশাসন সক্রিয়ভাবে কাজ করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।