ত্রিপুরায় বাম আমলে বিশালগড় ব্লকে এমজিএনরেগা প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি টাকার দুর্নীতির ঘটনা সামনে এসেছিল বলে অভিযোগ করেছেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী রতন লাল নাথ। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, ওই ঘটনায় তৎকালীন বিশালগড়ের বিডিও বিমল চক্রবর্তী-সহ মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে বিশালগড় থানায় মামলা দায়ের হয়। বর্তমানে মামলাটি ত্রিপুরা হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।মন্ত্রী দাবি করেন, এই দুর্নীতির ঘটনা কেগ রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছিল। তদন্ত শেষে ৪০টি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা বর্তমানে ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন’ প্রকল্পকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে দিশেহারা হয়েই তারা ভুল ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করছে বলে তিনি দাবি করেন।রতন লাল নাথ বলেন, বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন আইন এমজিএনরেগার তুলনায় একটি বড় ও যুগান্তকারী সংস্কার। এই নতুন আইনে কর্মসংস্থানের সুযোগ ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরনো আইনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা এবং জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।মন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও মজবুত হয়, মানুষের আয় বাড়ে এবং প্রাকৃতিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মোকাবিলায় গ্রামীণ সমাজ আরও সহনশীল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, নতুন প্রকল্প চালু হলে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ইউপিএ সরকারের আমলে মনরেগা প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এনডিএ সরকারের আমলে এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। তাঁর মতে, এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট যে গ্রামোন্নয়নে এনডিএ সরকার ধারাবাহিকভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।তিনি আরও বলেন, ত্রিপুরায় গত সাত বছরে রেগা প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এসেছে ৭ হাজার ৮০১ কোটি টাকা, যেখানে বাম আমলের শেষ সাত বছরে এই বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে গ্রামীণ শ্রমিকদের মজুরি বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা, যা আগের সাত বছরে ছিল ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা।মন্ত্রী জানান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকার ৯০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করে এবং রাজ্যের অংশ মাত্র ১০ শতাংশ। নতুন প্রকল্পের আওতায় জল সংরক্ষণ, গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিকূল আবহাওয়ার মোকাবিলা এবং গ্রামীণ জীবিকা ও সম্পদ শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পুরনো আইনে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শ্রমিকদের মজুরি পেতে বিলম্ব হতো বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, নতুন আইনে বিলম্বে মজুরি প্রদানের বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি মজুরি পাঠানো হচ্ছে, ফলে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং আর্থিক লিকেজের সম্ভাবনা কমেছে।তিনি জানান, গত সাত বছরে মনরেগা প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে ৮ লক্ষ ১০ হাজারের বেশি সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে তার আগের সাত বছরে এই সংখ্যা ছিল ৬ লক্ষ ৬৭ হাজার ৩৩২টি। বর্তমানে ত্রিপুরায় এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৬.৫৬ লক্ষ জব কার্ড এবং ১০.২০ লক্ষ নিবন্ধিত শ্রমিক।মন্ত্রী আরও দাবি করেন, মনরেগা বাস্তবায়নে ত্রিপুরা জাতীয় স্তরে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ২০২০-২১ সালে রাজ্যের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়, ২০২১-২২ সালে তৃতীয়, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ সালে চতুর্থ স্থান।সবশেষে তিনি বলেন, নতুন আইনটির মূল উদ্দেশ্য হল দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং একটি শক্তিশালী ও উন্নত গ্রাম গড়ে তোলা।