শাসকদলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণে প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণআগামী স্বশাসিত জেলা পরিষদ (এডিসি) নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট রাজনীতি থেকে সরে এসে একক শক্তিতে লড়াই করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিল তিপরা মথা। রবিবার আগরতলায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ জানান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শাসকদলের আচরণ পর্যালোচনা করেই দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে।সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, বিজেপি এডিসির ২৮টি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সব আসনেই জয়ী হবে। এই বক্তব্যকে কটাক্ষ করে প্রদ্যোত বলেন, “যদি বিজেপি মনে করে তারা ২৮টি আসনই পাবে, তাহলে তিপরা মথাও এককভাবেই লড়াই করবে। তখন জনগণই ঠিক করবে বিজেপি ২৮টি আসন পাবে, না কি মাত্র ২টি।”তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিপরা মথা কখনও সন্ত্রাস বা অশান্তির রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তবে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, আগে নিজের দলের নেতা-মন্ত্রীদের ভাষা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির একাংশ নেতা ও মন্ত্রীর বক্তব্য শুধু জোট শরিকদের নয়, বিরোধীদের প্রতিও চরম অসম্মানজনক।প্রদ্যোত দেববর্মণের কথায়, “প্রত্যেকের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যেভাবে আমাদের দলকে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি।” এই কারণেই সব দিক বিবেচনা করেই তিপরা মথা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি জানান।সাংবাদিক সম্মেলনে উঠে আসে তিপ্রাসা চুক্তির প্রসঙ্গও। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিপরা মথা সুপ্রিমো অভিযোগ করেন, ভারত সরকার চুক্তিকে সমর্থন করলেও রাজ্য সরকারের একাংশ নেতৃত্ব আদতে চায় না এই চুক্তি কার্যকর হোক। এই দ্বিচারিতাই চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।জনজাতি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রোমান হরফে পরীক্ষা দেওয়ার দাবিতে চলমান আন্দোলন নিয়েও দৃঢ় অবস্থান নেন প্রদ্যোত দেববর্মণ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, এই আন্দোলন থামানো হবে না। তাঁর বক্তব্য, জনজাতি ছাত্রছাত্রীরা বাংলায় পরীক্ষা দিতে রাজি নয়। যতদিন না জনজাতিদের নিজস্ব লিপি চালু হচ্ছে, ততদিন রোমান স্ক্রিপ্টেই পরীক্ষা দেওয়ার দাবি অব্যাহত থাকবে।এই প্রসঙ্গে জানানো হয়, বর্তমানে এডিসি এলাকার ১,৬৩৩টি বিদ্যালয়ে নার্সারি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ককবরক ভাষা রোমান হরফে পড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৬ সাল থেকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তও এই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন তিপরা মথা সুপ্রিমো। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে তিপরা মথা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, যদিও এই বিষয়ে দেশের একাংশ রাজনৈতিক শক্তি নীরব ভূমিকা পালন করছে।খেলাধুলার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নীতির সমালোচনা করেন প্রদ্যোত দেববর্মণ। তাঁর প্রশ্ন, “আইপিএলে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারকে ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় নেওয়া হয়, সেখানে ত্রিপুরার প্রতিভাবান ক্রিকেটার মনিশঙ্কর মুরাসিংকে কেন সুযোগ দেওয়া হল না—এর দায়িত্ব কার?”সব মিলিয়ে আসন্ন এডিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট রাজনীতি, তিপ্রাসা চুক্তি, জনজাতি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসকদলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরল তিপরা মথা।রাজনৈতিক মহলের মতে, একক শক্তিতে লড়াইয়ের এই ইঙ্গিত তিপরা মথার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে পারে। এখন দেখার, এই কৌশল এডিসি নির্বাচনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।