ধলাই জেলার লংতরাইভ্যালী মহকুমার প্রত্যন্ত এলাকা দক্ষিণ ধুমাছড়া। এই এলাকার কৃষকদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিকাজ। অথচ সেই কৃষিকাজই আজ অস্তিত্ব সংকটে। কারণ, এলাকায় সেচের জন্য থাকা একমাত্র জলের পাম্প মেশিনটি দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে চাষের মৌসুম এলেই চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন কৃষকরা।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় দশক আগে কৃষকদের সুবিধার্থে দক্ষিণ ধুমাছড়া এলাকায় একটি জলের পাম্প মেশিন স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল—খরা বা অনিয়মিত বৃষ্টির সময় জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই পাম্পটি বিকল হয়ে পড়ে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সেটি সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।গ্রামের কৃষকদের দাবি, তারা বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আধিকারিকদের কাছে এই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কখনও লিখিত আবেদন, কখনও মৌখিক অভিযোগ—সবই করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আশ্বাস মিলেছে, বাস্তব সমাধান আসেনি। ডিডব্লিউএস দপ্তরের গাফিলতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই সমস্যাটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তারা।জলের অভাবে জমিতে ঠিকমতো সেচ দিতে না পারায় ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য ফসল—সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন জমি ফাঁকা রেখে দিতে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে আর্থিক চাপ।স্থানীয় এক কৃষক জানান, “আমরা চাষ করে সংসার চালাই। জল না থাকলে চাষ করব কীভাবে? পাম্পটা ঠিক থাকলে অন্তত জমিতে জল দেওয়া যেত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শুধু কষ্টই পাচ্ছি।”আরেক কৃষকের বক্তব্য, “সরকার কৃষকদের উন্নয়নের কথা বলে। মন্ত্রীদের বক্তব্যে সবসময় কৃষকদের পাশে থাকার কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে আমাদের মতো প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের কেউ দেখে না।”জলের সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে এলাকার দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোর উপর। অনেক পরিবারই চাষবাস বন্ধ করে বিকল্প জীবিকার সন্ধানে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ দিনমজুরি, কেউ অন্য জেলায় কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রাম থেকে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।রবিবার দুপুরে দক্ষিণ ধুমাছড়া এলাকায় স্থানীয় কৃষকরা সংবাদ মাধ্যমের সামনে তাদের ক্ষোভ উগরে দেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানান, আর প্রতিশ্রুতি নয়—এখন তারা বাস্তব পদক্ষেপ চান। তাদের একটাই দাবি, দ্রুত ওই পাম্প মেশিনটি সংস্কার করে জমিতে নিয়মিত সেচের ব্যবস্থা করা হোক।কৃষকদের মতে, একটি পাম্প মেশিন বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকা শুধু যান্ত্রিক সমস্যার বিষয় নয়। এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার অভাবের স্পষ্ট উদাহরণ। জল ছাড়া কৃষি অসম্ভব—এই মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করেই যেন দক্ষিণ ধুমাছড়ার কৃষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।এলাকার সচেতন মহলের মত, যদি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করা হয়, তাহলে কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কৃষি যেমন গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তেমনি কৃষকরাই সমাজের ভিত্তি। সেই কৃষকদের ন্যূনতম সেচ সুবিধা দিতে ব্যর্থ হওয়া প্রশাসনের জন্য লজ্জার।এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সমস্যার দিকে কবে নজর দেয় প্রশাসন। দক্ষিণ ধুমাছড়ার কৃষকরা এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন—হয়তো এবার তাদের দাবি গুরুত্ব পাবে, হয়তো আবারও জমিতে জল ফিরবে, আর চাষের জমিতে সবুজের হাসি ফুটবে।