ত্রিপুরার সিপাহীজলা জেলার সুতারমুড়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা রাজ্যের স্থিতাবস্থাকে নাড়া দিয়েছে। শাসকদল বিজেপি ও জোট শরিক তিপ্রা মথার মধ্যে সংঘর্ষের জেরে দুই দলের সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা বিরোধী সিপিআইএমের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে অভিযোগ করেছেন যে সিপিএম সমর্থিত কিছু মানুষ স্থানীয় দলে ছড়িয়ে গিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।সুতারমুড়া বাজারে বিজেপির চড়িলাম মন্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত দলীয় যোগদান সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের শান্তি ও সুনাম নষ্ট করার জন্য একটি অংশ পরিকল্পনামাফিক কাজ করছে। তাঁর দাবি, ত্রিপুরা শান্তির রাজ্য হিসেবে পরিচিত, কিন্তু কিছু লোক অশান্তি সৃষ্টি করে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে চাইছে। তারা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তাই উত্তেজনা তৈরির পথ বেছে নিয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে.পি. নাড্ডা ত্রিপুরার প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না।২০১৮ ও ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগও পুনরায় সামনে এসেছে। জোট শরিক তিপ্রা মথার উদ্দেশে পরোক্ষে বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ দাবি করছে যে ২০২৩ সালে তাদের প্রার্থী দেওয়া না হলে বিজেপি সরকার গঠন সম্ভব হতো না। কিন্তু ২০১৮ সালে তাদের দেখা যায়নি, তবুও বিজেপিই একক ক্ষমতায় সরকার গড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বই তখনো বিজয়ের মূল কারণ ছিল।অন্যদিকে তিপ্রা মথা নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে তাদের প্রার্থী দেওয়াই বিজেপির জয়ের পথ সহজ করে দেয়। বিরোধী সিপিআইএমও অভিযোগ করে এসেছে যে তিপ্রা মথা বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগ করে শাসকদলকে ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করেছে।বিজেপির অভিযোগ, সোমবার সুতারমুড়া বাজারে তাদের সভা চলাকালীন তিপ্রা মথার সমর্থকরা হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বিপিন দেববর্মা বলেন, মথার এই ধরণের কর্মকাণ্ড বেশিদিন চলবে না। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালে তিপ্রা মথা ক্ষমতায় থাকবে না এবং সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যে তা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, জোট জানুয়ারি পর্যন্তই টিকবে, এরপর এই রাজনৈতিক চুক্তির ইতি ঘটবে।এরই মধ্যে তিপ্রা মথা এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে যে রাজ্যে সরকার গঠনের চাবিকাঠি তাদের হাতেই রয়েছে। তাদের দাবি, তিপ্রা মথা ছাড়া ত্রিপুরায় কেউ সরকার গঠন করতে পারবে না।বিরোধীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা আরও বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী অংশ সিপিএমের সমর্থন নিয়ে স্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষ অশৃঙ্খলতা মেনে নেবে না এবং যারা মানুষের অধিকার ক্ষুন্ন করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।সভায় মুখ্যমন্ত্রী জনজাতি উন্নয়ন প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলে জনজাতিদের জন্য পৃথক দপ্তর গঠিত হয়েছিল এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জনজাতি উন্নয়নে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। ত্রিপুরায় বিজেপি সরকার আসার পর জনজাতি সম্প্রদায়কে সরকারি নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।তিনি আরও বলেন যে সরকার শান্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে বা শক্তি প্রদর্শন করে কেউ রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারবে না।চড়িলাম মন্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজেপির প্রদেশ সাধারণ সম্পাদক বিপিন দেববর্মা, প্রদেশ সম্পাদক ডেভিড দেববর্মা, যুব মোর্চার নেতা নবাদল বণিক, সিপাহীজলা জেলার জেলাধিপতি সুপ্রিয়া দাস দত্ত, জেলা উত্তরের সভাপতি বিপ্লব চক্রবর্তী, মন্ডল সভাপতি তাপস দাসসহ অন্যান্য নেতৃত্ব।সুতারমুড়ার সংঘর্ষ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করেছে। বিজেপি–তিপ্রা মথা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে, আর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে রাজ্য সরকার শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ক্ষেত্রেই ছাড় দেবে না। অন্যদিকে তিপ্রা মথা নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে। সিপিআইএমও ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে।