লোকসভায় বন্দেমাতরমের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশপ্রেম, ইতিহাসচর্চা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি নতুন করে সামনে আনলেন ত্রিপুরার সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের স্মৃতি, স্বাধীনতার অগণিত বলিদান, এবং জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় স্লোগানের প্রতি প্রাপ্য সম্মানের দাবি।বিপ্লব কুমার দেব বলেন, “বন্দেমাতরম সেই স্লোগান, যা আমাদের ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম এই শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে আরও শৈল্পিক রূপ দেন।”
তাঁর মতে, শুধুমাত্র একটি গান বা স্লোগান নয়, বরং বন্দেমাতরম হল ভারতীয় জাতিসত্তার সংগ্রামের প্রতীক, যা যুগে যুগে মানুষকে উদ্দীপ্ত করেছে।সাংসদ জানান, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ শাসনের কারণে ভারত লাঞ্ছিত হয়েছে, অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছেন স্বাধীনতার স্বপ্নে। সেই ইতিহাসকে এক কথায় ধারণ করে বন্দেমাতরম। তাই এর দেড়শো বছরের পথচলা উদযাপন শুধু স্মারক অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারতীয় আত্মপরিচয়কে নতুন করে উপলব্ধির সুযোগ।
বন্দেমাতরমের ১৫০ বছর উপলক্ষে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান সাংসদ। তাঁর বক্তব্য—বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে এআই ও ডিজিটাল শিক্ষার গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনই ইতিহাস জানা সমান প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসই জাতিকে গড়ে তোলে। নতুন প্রজন্ম যদি স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা না জানে, তবে দেশপ্রেমের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, “ছাত্র-ছাত্রীদের বন্দেমাতরম, স্বাধীনতা সংগ্রামের অধ্যায়, এবং দেশগঠনে নেতাজি, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য মহাপুরুষদের অবদান সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হবে। এই মূল্যবোধই ভারতকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।”বিপ্লব দেবের বক্তব্যে রাজনৈতিক বার্তাও ছিল স্পষ্ট। তিনি দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হতো না।
বিশেষত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি বন্দেমাতরম সৃষ্টি করে ভারতীয় মননে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন, তাঁর স্মৃতিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।ত্রিপুরার বিধানসভা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বিধানসভার কার্যক্রম শুরু করেন জাতীয় সঙ্গীত *জনগণমন* দিয়ে এবং শেষ করেন বন্দেমাতরম দিয়ে।
তাঁর কথায়, এই প্রথা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং স্বাধীনতার ইতিহাসকে সম্মান জানানোর পথ।বক্তৃতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে কটাক্ষ করেন সাংসদ বিপ্লব দেব। তাঁর দাবি—তৃণমূল কংগ্রেস বলে থাকে যে বাংলার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি আত্মবলিদান দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামী, ঋষি বা মুনি-ঋষিদের আবক্ষ মূর্তি নির্মাণে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “বাংলার গর্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আজও কোনো আবক্ষ মূর্তি কেন নেই? যখন গুজরাতে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’ বিশ্বের সামনে ভারতের শক্তিকে তুলে ধরেছে, তখন বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ব্যক্তিত্বের স্মরণে যথাযোগ্য স্থাপনা কেন হবে না?
”সাংসদ এ-ও জানান যে, এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন—বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ করা হোক।বন্দেমাতরমের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি এই স্লোগান ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে।
১৮৭০-এর দশকে যখন বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম এটি লিখেছিলেন, তখন ভারতীয় সমাজে জাতীয়তাবাদের বীজ মাত্র অঙ্কুরিত হচ্ছিল। আর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় এই গান বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে অল ইন্ডিয়ার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিপ্লব দেবের মতে, সেই ঐতিহ্যের মূল্যায়ন সময়ের দাবি।বক্তব্যের রাজনৈতিক রঙ থাকলেও বিপ্লব দেবের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—ইতিহাসকে যথাযোগ্য সমাদর এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদানকে স্মরণে রাখা।
তাঁর মতে, জাতীয়তাবাদ কেবল স্লোগান নয়, বরং অতীতকে বুঝে ভবিষ্যত সৃষ্টি করার পথ।লোকসভায় আলোচনা শেষে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে দিল—বন্দেমাতরমের দেড়শো বছর শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি দেশের আত্মাকে নতুন করে অনুভব করার মুহূর্ত।