তেলিয়ামুড়ার ইচারবিল ষোলঘরিয়া এলাকায় শনিবার সকাল থেকেই শুরু হয় চাঞ্চল্যকর এক পরিস্থিতি। শিশু পাচারের সন্দেহে এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবককে ঘিরে ধরে মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরবেলা থেকে ওই যুবককে এলাকায় ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়।
কিছু বাসিন্দার দাবি, তিনি কয়েকজন শিশুর সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন, যা দেখে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। একজন বাসিন্দা চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে সতর্ক করলে মুহূর্তেই লোকজন জড়ো হয়ে যায়। উত্তেজিত জনতা যুবকটিকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে, আর পরিস্থিতি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।চোখের সামনে ঘটে যাওয়া উত্তেজনা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই জনতা রাস্তায় ফেলে তাকে মারধর শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জমায়েত হওয়া জনতার মধ্যে কেউই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেনি; বরং গুজবই তাদের আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। নির্দয়ভাবে চলে লাঠি ও ঘুষির আঘাত, যার জেরে যুবকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।পরিস্থিতির খবর পেয়ে তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত যুবককে উদ্ধার করে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং শরীরের বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। চিকিৎসা শুরুর পর তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, যুবকের বাড়ি বিহারে। তবে তিনি কেন ত্রিপুরার এই এলাকায় এসেছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ তার পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং চলাফেরার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আপাতত শিশু পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য মেলেনি বলে পুলিশ জানিয়েছে।ঘটনার জেরে ইচারবিল এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সম্ভাব্য অস্থিরতা রুখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে আক্রমণ বা শাস্তি দেওয়া আইনসম্মত নয়। এ ধরনের গণপিটুনি বহু সময় নির্দোষ মানুষকে প্রাণঘাতী বিপদের মুখে ফেলতে পারে।অভিজ্ঞ মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে গুজবের ভিত্তিতে গণপিটুনির ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি মানুষের অসচেতনতা ও হুজুগে বিশ্বাসের ফল।
বিশেষ করে শিশু পাচার বা অপহরণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে গুজব খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যদি কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা সন্দেহজনক মনে হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেওয়াই সঠিক প্রক্রিয়া। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে ভুক্তভোগী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি আইনগত জটিলতায় পড়েন হামলাকারীরাও।
ইচারবিলের এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—গুজবের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। সচেতনতা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি অভিযোগ যাচাই, সত্যতা অনুসন্ধান এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর মধ্যেই নিরাপত্তা নিহিত। এলাকাবাসী এখন পুলিশি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায়।