পশ্চিম খুপিলং আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, অসম্পূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প, আর স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কমিশন–ভিত্তিক দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে শুক্রবার সকাল থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়ল এলাকার মানুষ। ভোর থেকে উত্তেজনার পারদ চড়তে চড়তেই সকাল ১০টার সময় উদয়পুর–খুপিলং–আঠারভোলা সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বাসিন্দারা। দ্রুত দুই দিকেই যান চলাচল সম্পূর্ণ থমকে যায়। দিনের শুরুতেই শান্ত পরিবেশে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু বছরের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পশ্চিম খুপিলং অঞ্চলে মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। রাস্তা মেরামতের কাজ থেকে শুরু করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা—কোনও খাতেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি নেই। জনগণের সমস্যার কথা বারবার জানানো হলেও বিধায়ক রামপদ জমাতিয়ার দপ্তর থেকে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ তুলেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, উন্নয়নের নামে বরাদ্দ অর্থের বড় অংশই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কমিশনের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে, ফলে সরকারি প্রকল্প কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের একটি প্রতিনিধি দল বিষয়টি সরাসরি জেলাশাসকের কাছে তুলে ধরেন। অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় জরুরি পরিদর্শনও করা হয়। পরিদর্শনের পর দ্রুত ড্রেন নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসনিক কর্তারা। এই আশ্বাসেই স্থানীয়দের মনে সামান্য আশা জাগলেও বাস্তবে ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়।
অভিযোগ, কাজ শুরু হতে না হতেই উপপ্রধান জহরলাল নন্দীর নেতৃত্বে কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী কাজের ইঞ্জিনিয়ারকে বাধা দেয়। সরকারি কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতেই উন্নয়নমূলক প্রকল্পে এমন প্রকাশ্য হস্তক্ষেপে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের দুষ্কৃতিমূলক আচরণ প্রশাসন বা কোনও জন প্রতিনিধি–ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর মদত ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ছিনতাই করার জন্যই এমন বাধা দেওয়া হচ্ছে—যাতে কমিশন–নির্ভর চক্রের হাতে প্রকল্পটি তুলে দেওয়া যায়।
বিক্ষোভকারীদের দাবি আরও স্পষ্ট—রাজনৈতিক স্বার্থে উন্নয়নের বরাদ্দ অর্থকে ‘নিগু বাণিজ্য’ বা ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে খুপিলং অঞ্চলে যে উন্নয়নের অভাব প্রকট, তার মূল কারণ সরকারের উদাসীনতা ও অনিয়মের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
শুক্রবারের পথ অবরোধে অংশ নেওয়া একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ ঝাড়েন এভাবে—
“আমরা আর আশ্বাসে বিশ্বাস করি না। জেলাশাসক নিজে এসে কথাবার্তা না বলা পর্যন্ত এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়াব না। আমাদের অধিকার আমরা আদায় করবই।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প যদি এভাবেই রাজনৈতিক দখলদারির শিকার হতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভরসা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থ বরাদ্দের ব্যবহারে অসংগতি, আর স্থানীয় নেতাদের কমিশন–বাণিজ্য নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। মানুষের প্রশ্ন—সরকার কি আদৌ উন্নয়নে মন দিচ্ছে, নাকি শুধু কাগজে–কলমে পরিসংখ্যান সাজিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে?
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় যে উন্নয়নের জোয়ার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এলাকার মানুষ মনে করছেন তা বাস্তবে কার্যত অদৃশ্য। রাস্তার অবস্থা আগের মতোই জরাজীর্ণ, বহু স্কুল–অস্পতালে জনবল ও পরিকাঠামোর ঘাটতি, গ্রামীণ এলাকায় পানীয় জল–নালার সমস্যা, স্বাস্থ্য পরিষেবার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক ক্ষেত্রেই স্থবির হয়ে আছে। কোথাও কোথাও পূর্বের তুলনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলেও অভিযোগ।
সরকার দাবি করে যে ত্রিপুরা জুড়ে উন্নয়নের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পশ্চিম খুপিলংয়ের মতো অঞ্চলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারি প্রকল্পের কাজে বারবার বাধা, কমিশনের অভিযোগ, সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়া—এসবই মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে।
শুক্রবারের প্রতিবাদ তাই শুধু একটি সড়ক অবরোধ নয়—এটি সাধারণ মানুষের বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। খুপিলংয়ের বাসিন্দারা মনে করেন, উন্নয়ন হবে কিনা তা এখন নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। প্রশাসন যদি প্রকল্পগুলোকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রেখে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলেই কেবল গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নতি সম্ভব।
এলাকাবাসীর কথায়—
“আমরা উন্নয়ন চাই, রাজনৈতিক কারচুপি নয়। আমাদের দাবি সহজ—দুর্নীতির দায় স্বীকার করুন, কাজ শুরু করুন, আর ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিন। তাহলেই রাস্তা ছাড়ব।”
পশ্চিম খুপিলঙের এই আন্দোলন ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলেও একই সমস্যার প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, তা কি কখনও বাস্তবায়িত হবে? নাকি কাগজে–কলমে উন্নয়নের গল্পেই রাজ্যবাসীকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে?