ত্রিপুরায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগে উত্তাল রাজনীতি
উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি ঘিরে শুরু হওয়া রাজনৈতিক তাপ এবার ছড়িয়ে পড়ল ত্রিপুরা পর্যন্ত। উত্তরবঙ্গে বন্যা দুর্গত এলাকায় গিয়ে জনরোষের মুখে পড়েছিলেন বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু। তার পরেই আগরতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে ফের সরগরম রাজ্য রাজনীতি।
তৃণমূলের অভিযোগ, মঙ্গলবার আগরতলার বনমালিপুর এলাকায় বিজেপির ডাকা এক বিক্ষোভ মিছিল থেকে সরাসরি হামলা চালানো হয় তাদের কার্যালয়ে। চেয়ার, ব্যানার, কাচের দরজা—সবকিছু ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেছে তৃণমূল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকেও নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিজেপি পক্ষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, “তৃণমূল নিজেরাই নাটক সাজাচ্ছে, যাতে সহানুভূতি কুড়ানো যায়।”
ঘটনার সূত্রপাত উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিদর্শনের সময়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মালবাজার ও তার আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দেখতে গিয়েছিলেন আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু। অভিযোগ, ত্রাণ বণ্টন নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ সাংসদের ওপর গিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, এবং জনতার রোষে সাংসদ আহত হন।
তাকে দ্রুত শিলিগুড়ির এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার সকালেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেন সাংসদের। চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংসদের পরিবারের প্রতিও আশ্বাস দেন যে প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা রাজ্য সরকার করবে। মমতার এই মানবিক ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে সাংসদের স্ত্রী ও ছেলে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা করেন।
একদিকে আহত সাংসদকে দেখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মানবিকতা, অন্যদিকে ত্রিপুরায় বিরোধী দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর—এই দুই পরস্পরবিরোধী ঘটনা এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তৃণমূলের দাবি, খগেন মুর্মুর ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ত্রিপুরায় তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে বিজেপি কর্মীরা।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
“ত্রিপুরায় তৃণমূল কার্যালয়ে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। ক্ষমতাসীনরা যখন বিরোধীদের স্তব্ধ করতে হিংসাকে হাতিয়ার করছে, তখন তারা আসলে তাদের ভয় এবং নৈতিক দেউলিয়াকেই প্রকাশ করছে।”
“বিজেপি অফিস ভাঙতে পারে, পোস্টার ছিঁড়তে পারে, কর্মীদের ভয় দেখাতে পারে; কিন্তু তারা কখনোই তৃণমূল কর্মীদের প্রতিরোধের চেতনা মুছে দিতে পারবে না। ত্রিপুরা ও ভারতের মানুষ সবকিছু দেখছে।”
অন্যদিকে বিজেপির তরফে পাল্টা অভিযোগ, “তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নাটক করছে।” বিজেপির ত্রিপুরা রাজ্য সভাপতি জানান, “আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় তৃণমূলের কিছু উসকানিমূলক কার্যকলাপের জেরেই উত্তেজনা তৈরি হয়। আমরা কারও অফিসে হামলা চালাইনি।”
বিজেপি শিবিরের দাবি, তৃণমূল এই ঘটনার মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করার চেষ্টা করছে, কারণ রাজ্যে সংগঠন এখনো দুর্বল। তাঁদের মতে, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ত্রিপুরা সফরের আগে এ ধরনের অভিযোগ তুলে তাঁরা রাজনৈতিক নাটক সাজাচ্ছেন।”
ঘটনার পরই তৃণমূল সূত্রে জানা যায়, আগামীকাল বুধবারই ত্রিপুরায় প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও দলের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় থাকতে পারেন বলে জানা গেছে। তাঁদের সফরের মূল লক্ষ্য হবে ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয় ও কর্মীদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের মনোবল বাড়ানো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রিপুরায় এই সফরকে তৃণমূল কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কারণ, রাজ্যটিতে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করেছে সব রাজনৈতিক দল, এবং এই ঘটনা তৃণমূলের জন্য “সহানুভূতির পুঁজি” হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক মহলে অনেকে বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো পূর্ব ও উত্তর ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে “মুখোমুখি সংঘাত”-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি, অন্যদিকে রাজ্য ভিত্তিক শক্তিশালী মুখ তৃণমূল—এই দুইয়ের সংঘাত এখন রাজ্যসীমা পেরিয়ে প্রতিবেশী রাজ্যেও প্রভাব ফেলছে।
“তৃণমূলের এই অভিযোগ নিছক ঘটনাচক্র নয়। ত্রিপুরায় বিজেপির প্রভাব থাকলেও, তৃণমূল ধীরে ধীরে জায়গা তৈরি করছে। তাই স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার রুখতেই হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।”
অন্যদিকে বিজেপি সূত্র বলছে, “তৃণমূল তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে নাটক করছে—ত্রিপুরায় বাস্তবে কোনো গণভিত্তি নেই।”
ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ—দুই রাজ্যের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মেলবন্ধন দীর্ঘদিনের। সেই সূত্রেই তৃণমূল কংগ্রেস একাধিকবার ত্রিপুরায় নিজেদের সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ২০২১ সালের পর থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটি সেখানে সক্রিয়ভাবে প্রচার শুরু করে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বারবার হামলা, গ্রেফতার ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়েছে দলীয় কর্মীরা।
এই প্রেক্ষাপটে আগরতলার বনমালিপুর কার্যালয়ে হামলা তৃণমূলের কাছে আরেকটি “রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক” হয়ে উঠেছে। দলের এক নেতা বলেন, “আমরা ভয় পাই না। গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই আমরা চালিয়ে যাব।