আগামী ৩রা মার্চ আকাশে ঘটতে চলেছে এক বিরল ও চমকপ্রদ মহাজাগতিক ঘটনা—পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। দোলযাত্রার রঙিন উৎসবের রাতেই পৃথিবীর ছায়ায় সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন হবে চাঁদ। ফলে আনন্দ আর উৎসবের আবহের পাশাপাশি আকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অনন্য দৃশ্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো বিশ্বজুড়েও লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছেন।জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি স্থান বাদে দেশের অধিকাংশ এলাকা থেকেই এই চন্দ্রগ্রহণ আংশিক কিংবা সমাপ্তির পর্যায়ে দেখা যাবে। গ্রহণটি শুরু হবে দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে এবং চলবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি দেখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে, যখন চাঁদ প্রায় সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে। এই সময়ে আকাশে চাঁদের রং ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা যাবে, যা দর্শকদের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।ভারতের অধিকাংশ স্থানে চন্দ্রোদয়ের সময় গ্রহণের শেষাংশ দৃশ্যমান হবে। অর্থাৎ সন্ধ্যার আকাশে উদিত চাঁদকে দেখা যাবে আংশিকভাবে ছায়াচ্ছন্ন অবস্থায়। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু এলাকা এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি স্থানে পূর্ণ গ্রহণের সমাপ্তি পর্যায়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যাবে। ফলে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এই বিরল দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে। পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং আমেরিকার বিভিন্ন অংশের মানুষও আকাশের দিকে তাকিয়ে এই মহাজাগতিক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। ফলে এটি একটি আন্তর্জাতিক স্তরের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।চন্দ্রগ্রহণ কেন ঘটে, তা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। মূলত পূর্ণিমা তিথিতেই চন্দ্রগ্রহণ ঘটে। এই সময়ে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ এক সরলরেখায় অবস্থান করে এবং পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে চলে আসে। এর ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে এবং চাঁদ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায়। যখন চাঁদ সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর ছায়ার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন তাকে বলা হয় পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। আর যখন চাঁদের কেবল একটি অংশ ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়, তখন তাকে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ বলা হয়।পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের রং সাধারণত তামাটে লাল বা গাঢ় কমলা আভা ধারণ করে। এই বিশেষ রঙের কারণ হল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করার সময় নীল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে এবং লাল রঙের আলো চাঁদের উপর প্রতিফলিত হয়। এর ফলেই চাঁদকে “ব্লাড মুন” বা রক্তিম চাঁদ হিসেবেও দেখা যায়।এই ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা চাঁদের গতিপথ, পৃথিবীর ছায়ার গঠন এবং বায়ুমণ্ডলের প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এই গ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে এই ধরনের ঘটনা বিশেষ ভূমিকা রাখে।দোলযাত্রার উৎসবের আনন্দের মাঝেই আকাশে এই চমকপ্রদ দৃশ্য উপস্থিত হওয়ায় উৎসবের আমেজ আরও বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রঙের খেলায় মেতে ওঠার পাশাপাশি সন্ধ্যার আকাশে চোখ রাখলে দেখা মিলতে পারে এই বিরল চন্দ্রগ্রহণের। তাই বিজ্ঞানপ্রেমী থেকে সাধারণ দর্শক—সবার কাছেই ৩রা মার্চের এই সন্ধ্যা হতে চলেছে স্মরণীয়।আকাশ পরিষ্কার থাকলে খালি চোখেই এই চন্দ্রগ্রহণ সহজে দেখা যাবে। বিশেষ কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই এটি উপভোগ করা সম্ভব, কারণ সূর্যগ্রহণের মতো এতে চোখের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। ফলে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।