উন্নয়নের স্লোগান যতই জোরালো হোক, বাস্তবের ছবি কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। উদয়পুর কাঁকড়াবন বিধানসভার গর্জনমুড়া এলাকার ঘোষপাড়ায় সেই বাস্তবটাই আরও একবার সামনে এল। বছরের পর বছর বেহাল রাস্তায় নাজেহাল হয়ে শেষমেশ প্রশাসনের অপেক্ষা না করে নিজেরাই রাস্তা সংস্কারের কাজে নেমে পড়লেন ১১ নম্বর বুথের বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের কথায়, “ভোটের সময় সবাই আসে, কিন্তু কাজের সময় কাউকে দেখা যায় না।” ক্ষোভ আর হতাশায় ভরা এই বক্তব্য যেন গোটা এলাকার মনোভাবই তুলে ধরছে।
কাঁকড়াবন বিধানসভার অন্তর্গত গর্জনমুড়া ১১ নম্বর বুথের ওয়ার্ড নম্বর ৭ ঘোষপাড়া এলাকায় প্রায় ১৪০০ ভোটার ও ৪০০টিরও বেশি পরিবার বসবাস করে। অথচ তাদের নিত্যদিনের যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা আজও কার্যত ভাঙাচোরা, কাদা আর গর্তে ভরা। বর্ষাকালে হাঁটু সমান কাদা ও জলজটে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, আর শুকনো দিনে ধুলোর ঝড়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বামফ্রন্ট সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের সময়কাল—দুই পর্বেই রাস্তার উন্নয়নের আশ্বাস মিলেছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের দেখা মেলেনি। সরকার বদলেছে, নেতা বদলেছে, প্রতিশ্রুতি বদলেছে, কিন্তু ঘোষপাড়ার রাস্তাটির চেহারা একই রয়ে গেছে।
প্রতিদিন এই রাস্তায় হাঁটতে হয় স্কুল পড়ুয়া শিশুদের। বয়স্ক মানুষদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গর্ভবতী মহিলা কিংবা অসুস্থ রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স ঢোকানোই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় মাঝপথেই গাড়ি আটকে যায়। ফলে জীবন-জীবিকা ও স্বাস্থ্য—দুটোই বিপদের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ।
এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “বর্ষায় বাড়ি থেকে বের হওয়াই মুশকিল। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দুঃস্বপ্নের মতো। এত বছর ধরে শুধু আশ্বাস শুনছি।”
আরেকজনের কথায়, “ভোটের আগে নেতা-মন্ত্রী সবাই বাড়ি বাড়ি আসে। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজও নেয় না।”
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বহুবার বিধায়ক ও পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে। রাস্তা সংস্কারের জন্য স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অভিযোগ, শুধু প্রতিশ্রুতি মিলেছে, বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এই দীর্ঘ অবহেলা ও প্রশাসনিক নীরবতায় শেষমেশ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে এলাকাবাসীর। সম্প্রতি সকলে মিলে চাঁদা তুলে এবং নিজস্ব উদ্যোগে মাটি, খোয়া ও ইট জোগাড় করে রাস্তা মেরামতির কাজ শুরু করেন। হাতে কোদাল, বেলচা নিয়ে পুরুষ-মহিলা, যুবক—সকলেই কাজে নেমে পড়েন। সরকারি সাহায্য ছাড়াই নিজেদের শ্রমে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, “যে কাজ সরকারের করার কথা, সেটা জনগণকে কেন করতে হবে?” তাঁদের মতে, উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও গ্রামীণ এলাকার মৌলিক সমস্যা এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি রাস্তার সমস্যা নয়, বরং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থাকার ফলেই মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঘোষপাড়ার বাসিন্দাদের বক্তব্য স্পষ্ট—তারা আর আশ্বাস চান না, চান বাস্তব কাজ। তাঁদের মতে, রাস্তা সংস্কার কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জরুরি পরিষেবা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি ভাল রাস্তা।
এলাকার মানুষের সতর্কবার্তা, যদি দ্রুত স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে এই ক্ষোভ আগামী দিনে আরও বড় আকার নিতে পারে। ভোটের সময়ের প্রতিশ্রুতি আর কাজের সময়ের নীরবতার এই বৈপরীত্যই এখন বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—জনপ্রতিনিধিরা কি সত্যিই মানুষের জন্য কাজ করছেন, নাকি শুধু ভোটের অঙ্ক কষছেন?
গর্জনমুড়ার ঘোষপাড়ার মানুষ তাই আজ একটাই দাবি তুলেছেন—আর কথা নয়, এবার কাজ চাই।