তেলিয়ামুড়া থানাধীন মাইগঙ্গা এলাকায় ২৫ বছর বয়সি গৃহবধূ ঝুমা বিশ্বাসের আকস্মিক মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় এই রহস্যময় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উঠেছে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ। মৃতার বাপের বাড়ির পরিবারের দাবি, এটি কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু নয়—পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে ঝুমাকে।ঘটনা মঙ্গলবার গভীর রাতের। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রাতের ঘুমের মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ঝুমা। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাঁকে তড়িঘড়ি তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ঘটনার এখানেই শেষ নয়—মৃতা ঝুমার বাপের বাড়ির লোকজনের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া থেকে মৃত্যু ঘোষণা পর্যন্ত কোনও ধাপেই তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। এমনকি মৃত্যুর খবরও নাকি গোপন করার চেষ্টা করেছে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা।ঝুমার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মেয়েটি শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছিলেন। কখনও পণ, কখনও পারিবারিক বিবাদ—এইসব নানা অজুহাতে নিয়মিতভাবে অত্যাচার করা হতো তাঁর ওপর। পরিবার জানিয়েছে, এই অত্যাচার নিয়ে ঝুমা একাধিকবার কেঁদে ফোনে জানিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের সেই নির্যাতনেরই করুণ পরিণতি এই মৃত্যু।মৃতদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথাও দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেছেন, “ঝুমাকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। রোগ-ব্যাধি বা হঠাৎ অসুস্থতা নয়—পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খুন করা হয়েছে আমাদের মেয়েকে।”এই অভিযোগ ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও বলছেন, ঝুমার বিয়ের পর থেকেই তাঁর ওপর মানসিক চাপ ও গৃহকলহের নানা ইঙ্গিত তাঁরা পেতেন। রাতে আকস্মিক অসুস্থতার ব্যাখ্যায় অনেকেই সন্দিহান।ঘটনার খবর পেয়ে তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায়। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বক্তব্য, ঘটনাটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাজনিত। তাঁদের দাবি, ঝুমা রাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন এবং খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।তবে এই দাবি মানতে নারাজ মৃতার পরিবার। তাঁদের মতে, যদি সত্যিই বুকে ব্যথা বা অসুস্থতা হয়ে থাকে, তাহলে কেন রাতের ওই সময় তাঁদের ফোন করা হলো না? কেন লুকোছাপি করা হলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে? কেন মৃত্যুর খবর পৌঁছতে এত সময় লেগে গেল?এই প্রশ্নগুলিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মাথাতেও। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। ঝুমার বিবাহিত জীবনের বিবাদ, পণ সংক্রান্ত সম্ভাব্য চাপ, আগের কোনও অভিযোগ কিংবা প্রতিবেশীদের বয়ান—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।স্থানীয় মহলে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে—এমন একটি মৃত্যুর খবর শোনার পরও শ্বশুরবাড়ির কেউ কি জরুরি ভিত্তিতে মৃতার বাপের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন অনুভব করলেন না? এলাকাবাসীর মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি এত বড় ঘটনার বিষয়ে পরিজনদের জানানো স্বাভাবিক মানবিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন না হওয়াই সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।এদিকে, ঝুমার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতনের প্রশ্নটিও সামনে উঠে আসছে। বিশেষ করে নববিবাহিত বা তরুণী গৃহবধূদের ওপর শারীরিক, মানসিক এবং পণজনিত অত্যাচারের ঘটনা দেশে প্রায়শই শিরোনামে উঠে আসে। সেসব ঘটনার পরিণতিও অনেক সময় এমনই রহস্যজনক মৃত্যুতে গিয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উঠে আসবে। এরপরই নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নিয়ে এগোনো সম্ভব হবে।” তবে তার আগেই শ্বশুরবাড়ির সকল সদস্যকে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।মাইগঙ্গা এলাকার মানুষ এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—২৫ বছরের ঝুমা বিশ্বাস সত্যিই কি আকস্মিক অসুস্থতার শিকার হয়েছিলেন, নাকি দীর্ঘদিনের গৃহ নির্যাতনের বলি? এই মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে আছে কি কোনও গভীর পারিবারিক বিবাদ?ঝুমার পরিবারের আর্তি একটাই—তাদের মেয়ের মৃত্যুর বিচার হোক। তাঁরা চাইছেন কঠোর তদন্ত, কঠোর শাস্তি এবং সত্য উদঘাটন। অন্যদিকে এলাকাবাসীর দাবি, এই ঘটনাকে কোনওভাবেই ধামাচাপা দেওয়া চলবে না।সব নজর এখন পুলিশি তদন্তের দিকে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ফরেনসিক বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত বলবে—ঝুমার মৃত্যু নিছকই একটি দুর্ঘটনা, নাকি তা এক ভয়ঙ্কর অপরাধের পরিণতি।