রাজ্যের স্কুলগুলিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। পূর্বতন সরকারের আমলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের ঘাটতির কারণে আজ সরকারকে অধিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল আর্থিক ঋণের বোঝা এবং ১০৩২৩ সহ একাধিক মামলা সংক্রান্ত চাপ বর্তমান সরকারের উপর এসে পড়েছে। এমনই মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
শনিবার মোহনপুরের মধু চৌধুরী পাড়া দ্বাদশ স্কুল মাঠে নবনির্মিত স্কুল ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এই উপলক্ষে মধু চৌধুরী পাড়া দ্বাদশ স্কুলের নবনির্মিত ভবনের সরাসরি উদ্বোধনের পাশাপাশি তারাপুর দ্বাদশ স্কুল, গোপালনগর দ্বাদশ স্কুল এবং বেরিমুড়া দ্বাদশ স্কুলের নতুন ভবনের ভার্চুয়াল উদ্বোধনও করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা বলেন, পূর্বতন সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনও উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারকে উন্নয়নের গতি বাড়াতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকার বিপুল আর্থিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ১০৩২৩ সহ বিভিন্ন মামলা জনিত চাপ রেখে গেছে, যা বর্তমান সরকারের কাজের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এই উন্নয়ন ভাবনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে জনজাতি গোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নের ওপর প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সেই লক্ষ্যেই রাজ্য সরকারও নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, সারা দেশে প্রায় ৭০০টি জনজাতি গোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে ত্রিপুরায় ১৯টি জনজাতি গোষ্ঠীর বসবাস। তিনি বলেন, জাতি, জনজাতি, মণিপুরী, সংখ্যালঘু সহ সমাজের সকল অংশের মানুষের ঐক্যই রাজ্যের প্রকৃত শক্তি। এই ঐক্যকেই তিনি ‘থানসা’ বলে অভিহিত করেন। সকলকে একসাথে নিয়ে “নতুন ত্রিপুরা” গড়ে তোলার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজ্যের জনজাতি সম্প্রদায়ের সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বলেন, জনজাতি সমাজের একজন মহিলা দ্রৌপদী মুর্মুকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা জনজাতি সমাজের ক্ষমতায়নের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। তাঁর মতে, রাষ্ট্রবাদী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী সরকারই প্রকৃত অর্থে জনজাতি সমাজের উন্নয়নের কথা বলে।
মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, অতীতেও জনজাতি সমাজকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করার চেষ্টা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সরকার সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে রাজ্যে নজরকাড়া উন্নয়ন হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন হচ্ছে। জনজাতি গোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর যত বেশি উন্নয়ন হবে, তত বেশি সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে তারাই রাজ্যের উন্নয়নের মূল কারিগর হয়ে উঠবে।
শিক্ষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা বা বইনির্ভর জ্ঞানই প্রকৃত শিক্ষা নয়। খেলাধুলা ও সহপাঠক্রমিক কার্যকলাপে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, শিক্ষার কোনও শেষ নেই, প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাই অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যারও সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, একসময় ত্রিপুরায় মাত্র চারটি একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে ২১টি নতুন একলব্য স্কুলের অনুমোদন মিলেছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ১২টি স্কুল চালু হয়েছে এবং আগামী মার্চ মাসের মধ্যে আরও ৬টি স্কুল চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এই স্কুলগুলি মূলত জনজাতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্মিত।
উল্লেখ্য, মধু চৌধুরী পাড়া দ্বাদশ স্কুল, তারাপুর দ্বাদশ স্কুল, গোপালনগর দ্বাদশ স্কুল এবং বেরিমুড়া দ্বাদশ স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নে মোট প্রায় ২০ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমান সরকার পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং সে কারণে বাজেটেও পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সংস্থান রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রকল্পের কাজ নিয়মিতভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ, লেফুঙ্গা বিএসির চেয়ারম্যান রণবীর দেববর্মা, ভাইস চেয়ারম্যান বুধু দেববর্মা, হেজামারা বিএসির ভাইস চেয়ারম্যান নিহার রঞ্জন দেববর্মা, শিক্ষা অধিকর্তা এন সি শর্মা সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অঙ্গীকার আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।