রাজ্যে কেন্দ্র–রাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তোলে, কেন্দ্রীয় সরকার নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাকে বঞ্চিত করছে। ১০০ দিনের কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্র নাকি পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখছে। কিন্তু মালদহের সভা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্য, “বাংলাকে নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকারকে বারবার আটকে দিচ্ছে তৃণমূল সরকারই। এর ফলভোগ করছে বাংলার সাধারণ মানুষ।”মালদহে অনুষ্ঠিত ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’-য় এদিন প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কেন্দ্র বহু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ চালু করলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে সেই প্রকল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইছে না। তাঁর কথায়, “দেশের বহু বিরোধী শাসিত রাজ্যেও কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিখুঁতভাবে চলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে বর্তমান রাজ্য সরকার। রাজনৈতিক মানসিকতা না বদলালে বাংলার মানুষ তাদের সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থাকবে।”প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়া উদ্যোগ মুক্ত বিদ্যুৎ যোজনা—যার লক্ষ্য দেশের দরিদ্র পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনা—দেশের বহু রাজ্যে সক্রিয় হয়েছে। লক্ষ লক্ষ পরিবার ইতিমধ্যেই এর সুবিধা পাচ্ছে। মোদীর যুক্তি, “এই প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে কেন্দ্র। আমি চাই, পশ্চিমবঙ্গের পরিবারেরাও একই সুবিধা পাক। কিন্তু তৃণমূল সরকার সেই সুযোগই দিতে দিচ্ছে না।”তিনি আরও বলেন, যদি এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বহু নিম্নআয়ের পরিবারের মাসিক আর্থিক বোঝা কমে যাবে। বিদ্যুৎ বিল শূন্য হওয়ার কারণে গৃহস্থের সঞ্চয় বাড়বে এবং বিশেষ করে গ্রামের পরিবারগুলোর উপকার হবে। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, “গরীব মানুষের উন্নয়নমূলক কাজে রাজ্য সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধা দিচ্ছে। যার জন্য দায়ী রাজনীতির সংকীর্ণতা।”সভা থেকে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আরও সরব হন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “বাংলায় উন্নয়ন আটকে আছে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাবে। কেন্দ্রের টাকা যথাযথ পথে ব্যবহার না হওয়ার ফলে প্রকল্পগুলোর সুবিধা নিচু প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন কেন্দ্রের একাধিক স্কিম—যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাফল্যের সঙ্গে চলছে—পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না?এদিন প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, “যদি বাংলার মানুষ তৃণমূল সরকারকে সরিয়ে উন্নয়নমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে রাজ্যে একের পর এক প্রকল্প দ্রুত পৌঁছে যাবে। দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গও সুবিধা পাবে কেন্দ্রীয় কল্যাণমূলক কর্মসূচির।”অন্যদিকে, এই ধরনের অভিযোগের জবাবে তৃণমূল কংগ্রেস আগেও বলেছে, কেন্দ্র রাজনৈতিক কারণেই বাংলার সরকারি প্রকল্পে অর্থ প্রেরণ আটকে রাখে। তাদের বক্তব্য, বিজেপি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যের দাবি খারিজ করছে এবং তৃণমূল সরকারকে চাপের মুখে ফেলতে কেন্দ্রীয় অনুদান বন্ধ রাখা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের যুক্তি, কেন্দ্রের বঞ্চনা না হলে বহু প্রকল্প আরও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হতে পারত।তবে মালদহের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রীর দাবি, তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাঁর কথায়, “বাংলার মানুষ উন্নয়ন চায়। তারা ভালো রাস্তা, পরিষ্কার জল, সুলভ বিদ্যুৎ এবং কর্মসংস্থান চায়। কিন্তু যে সরকার প্রকল্পের পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেই সরকার ক্ষমতায় থাকলে মানুষের জীবনমান বদলানো সম্ভব নয়।”আসন্ন নির্বাচনের আগে কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাতের এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দেবে। বাংলায় উন্নয়ন আটকে রাখার দায় কোন পক্ষের—সেই বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করল মালদহের এই সভা।