ত্রিপুরার রেল পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রেল মন্ত্রক। রাজ্যের পশ্চিম ত্রিপুরা জেলায় জিরানিয়া থেকে বোধজং নগর পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন রেললাইন নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত স্থান জরিপ (ফাইনাল লোকেশন সার্ভে) পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রেল অংশের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয় ধার্য করা হয়েছে বলে জানা গেছে।রেল আধিকারিকদের মতে, এই জরিপ অনুমোদন প্রকল্পটির বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জরিপের মাধ্যমে রুটের প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলি খতিয়ে দেখা হবে। এর ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।জিরানিয়া বর্তমানে লুমডিং–সাব্রুম রেললাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। এই রুটটি ইতিমধ্যেই ত্রিপুরার যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জিরানিয়া থেকে বোধজং নগর পর্যন্ত নতুন রেল সংযোগ স্থাপিত হলে তা রাজ্যের শিল্পাঞ্চলগুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ করিডোর হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন রেললাইন শিল্পজাত পণ্য পরিবহণকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে। রেলপথে কাঁচামাল আনা এবং প্রস্তুত পণ্য বাজারে পাঠানো অনেক বেশি সাশ্রয়ী হওয়ায় শিল্প ক্ষেত্রের উৎপাদন খরচ কমবে এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাড়বে।বোধজং নগর পশ্চিম ত্রিপুরার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলে রাবার, বাঁশ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই সম্পদ-ভিত্তিক শিল্পজাত পণ্য বর্তমানে মূলত সড়কপথের উপর নির্ভরশীল।নতুন জিরানিয়া–বোধজং নগর রেললাইন চালু হলে এই শিল্পগুলির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ব্যবসায়ীদের মতে, এতে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও মজবুত হবে এবং রাজ্যের বাইরের বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে রেল পরিকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ত্রিপুরা যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে, তাই এখানে রেল যোগাযোগ উন্নয়ন কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত রেল নেটওয়ার্ক একদিকে যেমন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করবে, অন্যদিকে তেমনই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করবে। সীমান্ত এলাকায় দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।রেল মন্ত্রকের অনুমোদিত এই চূড়ান্ত স্থান জরিপ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতেও শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন রেললাইন ঘিরে গুদামজাতকরণ, লজিস্টিক হাব, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ মনে করছেন, উন্নত রেল যোগাযোগ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাকেও আরও সহজ করবে। পণ্য পরিবহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাত্রী পরিষেবা চালু হলে সাধারণ মানুষও এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করবেন।রেল আধিকারিক সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত স্থান জরিপে প্রস্তাবিত রুটের প্রতিটি দিক বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে। এর মধ্যে থাকবে এলাকার ভৌগোলিক ও ভূ-প্রকৃতিক বৈশিষ্ট্য, মাটির ধরন ও বহনক্ষমতা, প্রস্তাবিত সেতু ও অন্যান্য কাঠামোর অবস্থান, সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব এবং নির্মাণ ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব।এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরি করা হবে, যা পরবর্তী বিবেচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রেল মন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হবে।জিরানিয়া–বোধজং নগর নতুন রেললাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা ত্রিপুরার রেল মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। শিল্প উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং কৌশলগত নিরাপত্তা—সব দিক থেকেই এই প্রকল্প রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বর্তমানে চূড়ান্ত স্থান জরিপের অনুমোদনের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনার দিকেই এক ধাপ এগিয়ে গেল রেল মন্ত্রক।