শীতের আগমন মানেই বাংলার ঘরে ঘরে পিঠাপুলির সুবাস, আর সেই সাংস্কৃতিক রসদকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে প্রতিবছরই রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আলপনা গ্রামে আয়োজিত হয় পিঠাপুলি উৎসব। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির মতো বাঙালির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে সামনে রেখে এই আয়োজন এখন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই নয়, বরং হয়ে উঠেছে রাজ্যের পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় ঐতিহ্য, স্বাদ, শিল্প–সংস্কৃতি এবং সমাজের আন্তঃসম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই উৎসব রাজ্যের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এবারও সেই উৎসবকে আরও পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত করার লক্ষ্যে শুক্রবার আগরতলা পুর নিগমের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হলো প্রস্তুতি বৈঠক। বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র দীপক মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাধিপতি বিশ্বজিৎ শীলসহ পুরনিগমের বিভিন্ন পর্যায়ের আধিকারিকরা। আগামী উৎসবকে ঘিরে কী ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে, কীভাবে আয়োজন আরও আকর্ষণীয় করা যায় এবং দর্শনার্থীদের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়—এসব নিয়েই বৈঠকে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
মেয়র দীপক মজুমদার জানান, প্রতি বছরের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এ বছর উৎসবকে আরও বৃহত্তর পরিসরে আয়োজন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পিঠাপুলি উৎসব শুধু খাবারের উৎসব নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি স্বতন্ত্র সুযোগ। শীতের সময় এই উৎসব মানুষের মধ্যে যে আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনমেলার আবহ তৈরি করে, তা আমাদের সমাজকে আরও সুদৃঢ় করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই উৎসবে আসা দেশ–বিদেশের পর্যটকদের কারণে আলপনা গ্রামের পরিচিতি বহু গুণ বেড়েছে। তাই এ বছর পর্যটন ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব আলোকসজ্জা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
পিঠাপুলি উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে বিভিন্ন ধরনের পিঠার বহর—পাটিসাপটা, দুধচিটে, সেমাই পিঠা, ভাপা পিঠা, চিতই থেকে শুরু করে মাংসের নক্সাপিঠা—অনেক কিছুই থাকে বিক্রির তালিকায়। শুধু পিঠা–পুলিই নয়, সঙ্গে থাকে স্থানীয় শিল্পীদের হাতের তৈরি হস্তশিল্প, লোকসংগীতের পরিবেশনা, নাচগানসহ আরও নানা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। এসব মিলিয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে এক সর্বাঙ্গীণ অভিজ্ঞতার প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একদিকে যেমন স্থানীয় রাঁধুনি ও শিল্পীদের হাতে তৈরি জিনিসের প্রচার ও বিক্রি বাড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বৈঠকে আলোচনার সময় বেশ কিছু নতুন প্রস্তাবও উঠে আসে, যেমন—
- উৎসব প্রাঙ্গণে আরও সুশৃঙ্খল স্টল ব্যবস্থাপনা
- অগ্নিনির্বাপণ ও স্বাস্থ্যসেবার অস্থায়ী ব্যবস্থা
- ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা বৃদ্ধি
- স্থানীয় শিল্পীদের জন্য আলাদা প্রদর্শনী এলাকা
- ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন
এছাড়াও, দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে গাইড ভলান্টিয়ার নিয়োগ এবং তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করার কথাও বিবেচনা করা হয়েছে। উৎসবকে পরিবেশবান্ধব রাখতে প্লাস্টিকবিরোধী প্রচার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হবে।
উৎসবে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নানা লোকনৃত্য, কীর্তন, বাউলগানসহ নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শিল্পরূপ উপস্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে রাজ্যের সংস্কৃতি বিভাগ, পর্যটন দফতর এবং পুর নিগমের যৌথ উদ্যোগে একটি সমন্বিত কর্মসূচি প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।
বৈঠকে উপস্থিত আধিকারিকরা জানান, প্রতিবারই পিঠাপুলি উৎসব দর্শনার্থীদের বিশাল সাড়া পায়। এর ফলে আলপনা গ্রাম ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব উপলক্ষে অনেক পরিবার তাদের বাড়িতে পিঠা প্রস্তুত করে আসেন এবং সামাজিক মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগের ফলে শুধু ঐতিহ্যই রক্ষিত হচ্ছে না, বরং স্থানীয় মানুষের জীবন–জীবিকাও উন্নত হচ্ছে।
সবশেষে, উৎসব নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে অচিরেই একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে বলে মেয়র জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বছরও পিঠাপুলি উৎসব মানুষের হৃদয়ে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে থেকে যাবে।