ত্রিপুরায় ২০২৬ সালের স্বশাসিত জেলা পরিষদ (এডিসি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি এবং তিপ্রা মথার মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে চলেছে। রাজ্যের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি গত কয়েক মাস ধরেই একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। নানা সংঘর্ষ, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত রাজনীতির ময়দান। মঙ্গলবার বিজেপি জনজাতি মোর্চার রাজ্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিপিন দেববর্মার বক্তব্যে সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।বিপিন দেববর্মা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারির পর বিজেপি–তিপ্রা মথা জোট আর থাকছে না। তাঁর দাবি, পাহাড়ি এলাকায় জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজেপি একাই লড়বে এবং এডিসি দখল করবে। তিনি বলেন, মথার জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে, তাই হতাশা থেকেই তারা হিংসার পথে হাঁটছে। দলীয় সূত্রে আরও দাবি, চলতি মাসের ১৩ তারিখে আগরতলায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বিভিন্ন দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন।তিপ্রা মথার উত্থান খুব দ্রুত এবং গুরুত্ববহ। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই দলটি এডিসি নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১৩টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। পরে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে তিপ্রা মথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপির শরিক দলে পরিণত হয়। সেই সময় দাবি ছিল, উপজাতি উন্নয়ন, ভাষা, সংস্কৃতি, জমির অধিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে ছয় মাসের মধ্যেই কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।চুক্তির কিছুদিন পর থেকেই দুই দলের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। চলতি বছরের আগস্টে খোয়াই জেলার আশারামবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন কি বাত অনুষ্ঠান চলার সময় বিজেপি সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা তখন তিপ্রা মথাকে লক্ষ্য করে বলেন, হিংসাত্মক আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। এরপর দক্ষিণ ত্রিপুরা, পশ্চিম ত্রিপুরা, সিপাহীজলা ও গোমতী জেলায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত মাসে খুমুলুঙে পেটো বোমা বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ, আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।তবে তিপ্রা মথা সব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি তোলে। তাদের বক্তব্য, আক্রান্ত ছিল তারাই। বরং মুখ্যমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আজ সন্ধ্যায় তিপ্রা মথার হয়ে দলের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী বৃষকেতু দেববর্মা জানান, মথা সবসময় উপজাতি যুবকদের হাতে কলম তুলে দিতে চায়, বন্দুক নয়। তিনি বলেন, জোট ভাঙা বা সরকার ছাড়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের সুপ্রিমো রাজ্যে ফিরলে বিস্তারিত আলোচনা হবে।তিপ্রা মথার মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য পূর্ণচন্দ্র জমাতিয়া দাবি করেন, ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় তিপ্রা মথার সাহায্যেই সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এডিসি নির্বাচনেও তিপ্রা মথা আরও বড় ব্যবধানে জিতবে। গতবার ১৮টি আসনে জেতার পর আরও কয়েকজন তাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। আগামী বছরে অন্তত ২৫ থেকে ২৬টি আসনে জয় প্রত্যাশা করছেন তিনি।বিরোধী সিপিআইএম অবশ্য দুই দলের এই সংঘাতকে প্রহসন বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনের আগে বিজেপি এবং তিপ্রা মথা পর্দার আড়ালে সমঝোতা করে নেয় এবং ভোটের পরে সরকার গঠন করে। সিপিআইএমের অভিযোগ, এডিসি এলাকায় মথার শাসনকালে রাস্তাঘাট, পানীয় জলসহ মৌলিক পরিষেবার অবনতি ঘটেছে।ত্রিপুরার দুই–তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এডিসি, যেখানে ১৯টি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। রাজ্যের মোট ৩৭ লক্ষ জনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশই উপজাতিভুক্ত। তাই এডিসি নির্বাচন শুধু পাহাড়ি এলাকার নয়, পুরো ত্রিপুরারই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এই প্রেক্ষাপটে বিজেপি ও তিপ্রা মথার টানাপোড়েন ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে আরও গভীর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।