ত্রিপুরায় কুলাই হাসপাতালে দুই মাসের নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য! নার্সের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
ধলাই জেলার কুলাই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আবারও বিতর্কের ঝড়। মাত্র দুই মাস বয়সী এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে শুক্রবার দুপুর থেকে হাসপাতাল চত্বর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি নার্সের অবহেলার অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শিশুটি প্রথমে গন্ডাছড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চার দিন আগে তাকে কুলাইস্থিত ধলাই জেলা হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে শিশুটির তত্ত্বাবধান করছিলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. পবন দেববর্মা। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, ভর্তি নেওয়ার সময় থেকেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক; তার শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণসহ একাধিক জটিলতা ছিল।
শুক্রবার দুপুরে আচমকাই শিশুটির মৃত্যু হলে পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিবার দাবি তোলে—মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে নার্স বাচ্চাটিকে দুটি ইনজেকশন দেন। ইনজেকশন দেওয়ার পরই নাকি শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে মারা যায়। পরিবারের অভিযোগ, “ইনজেকশন দেওয়ার সময় নার্সের ভুলের কারণেই আমাদের সন্তানকে হারাতে হলো।”
পরিবারের এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকেই উত্তেজিত জনতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নার্সের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা পরিবারের দাবি মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, শিশুটির মৃত্যু পূর্ববর্তী শারীরিক জটিলতার ফলেও হতে পারে। ডা. পবন দেববর্মা বলেন—
“শিশুটির শরীরে পূর্ব থেকেই গুরুতর সংক্রমণ ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা ছিল। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে ইনজেকশনই মৃত্যুর কারণ কিনা, তা ময়নাতদন্ত না হলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।”
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, অনেক সময় জরুরি ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়ার পরেও অত্যন্ত অসুস্থ শিশুর অবস্থার হঠাৎ অবনতি হতে পারে। তবে পরিবারের অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির ওপর একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা নার্স বর্তমানে কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিউটি লগবুক এবং চিকিৎসকদের বিবরণ বিশ্লেষণ করে। তদন্ত কমিটির এক সদস্যের মতে—
“পরিবারের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। একই সঙ্গে শিশুটির চিকিৎসার যাবতীয় নথি খতিয়ে দেখা হবে। ত্রুটি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, চিকিৎসার চাপে প্রায়ই নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়। এ ধরনের অভিযোগের কারণ কখনও কখনও ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। তাই তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলেই মনে করছেন তারা।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালের সামনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে নার্সের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে পুলিশ মোতায়েনের পর। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিবারকে শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসারেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার মতোই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন—শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। চিকিৎসকরা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে জানতে ময়নাতদন্ত রিপোর্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পরই বোঝা যাবে, ইনজেকশনের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল কিনা, নাকি শিশুটির আগে থেকেই থাকা জটিলতা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসতেই ধলাই জেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালগুলিতে প্রায়ই নজরদারি ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব দেখা যায়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর তদারকির দাবি করছে সাধারণ মানুষ।
পরিবারের সদস্যরা এখনো শোক সামলাতে পারছেন না। তাদের দাবি, “আমরা ন্যায়বিচার চাই, কার ভুলে আমাদের বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে, তা জানতে হবে।” অন্যদিকে হাসপাতাল প্রশাসন বারবার অনুরোধ করছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন ভুল তথ্য ছড়ায় না।