রাজ্য বিধানসভায় এক সাংবাদিক সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করলেন বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, সাংবিধানিক পদে থেকে এবং রাজ্য স্তরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকেও মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ধারাবাহিকভাবে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করে চলেছেন, তা শুধু অনভিপ্রেতই নয়, রাজ্যের সম্মানকেও ক্ষুণ্ণ করছে।বিরোধী দলনেতা বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলে তা কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং গোটা রাজ্যের মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। এমন অবস্থানে থেকে দায়িত্বশীল মন্তব্য করা মুখ্যমন্ত্রীর কর্তব্য, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ প্রসঙ্গে জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, বিজেপির সঙ্গে যুক্ত যে দুই রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক অতীত খতিয়ে দেখলেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। তাঁর দাবি, ১৯৮০ সালে এই শক্তিগুলি অন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এডিসি গঠনের পর তাদের চার দফা দাবির অন্যতম ছিল রাজ্য থেকে বিদেশিদের বিতাড়ন। আজ নাম বদলালেও সেই দাবির মূল সুর অপরিবর্তিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।এই প্রসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, সেই সময়ে যে রাজনৈতিক দলে এই শক্তিগুলি যুক্ত ছিল, সেই দলেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ছিলেন। ফলে এডিসি বিরোধিতার ইতিহাস নতুন নয় বলেই তাঁর বক্তব্য। অথচ এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা অস্বীকার করে বর্তমান সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তোলেন বিরোধী দলনেতা।পাপাই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, ওই ঘটনা তৎকালীন সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিজ দলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল। এর সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কোনও যোগ ছিল না। অথচ আজ সেই ঘটনাকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন মঞ্চে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধী দলনেতা বলেন, ভোট-পূর্ব সন্ত্রাস, জনজাতি এলাকায় শিক্ষাব্যবস্থার অভাব, ১৯৮০ সালের দাঙ্গা কিংবা উগ্রপন্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলিতে একের পর এক বামফ্রন্ট সরকারকে দোষারোপ করা হচ্ছে। এমনকি বিজেপি ও তিপরা মথার মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্যও তাঁকে দায়ী করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জিতেন্দ্র চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার নজির ছিল না। অথচ ২০১৮ সালের পর থেকে প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের কার্যালয় একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করছেন বামফ্রন্ট আমলে ভোটের আগে ও পরে সন্ত্রাস চলত, কিন্তু বাস্তবে বর্তমান সরকারের আমলেই সারা বছর ধরে সন্ত্রাস চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর দাবি, অপরাধমূলক ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত ও গ্রেফতারে পুলিশ ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ সবকিছু জেনেও মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে চলেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, বিজেপির শরিক দল তিপরা মথা যদি ২২টি আসনে প্রার্থী না দিত, তবে ওই আসনগুলিতে সিপিআইএমের জয় নিশ্চিত ছিল। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ওই নির্বাচনে সিপিআইএম ও কংগ্রেসের মধ্যে কোনও অবৈধ জোট ছিল না; কেবলমাত্র আসন সমঝোতার ভিত্তিতেই লড়াই হয়েছিল। বিপরীতে বিজেপি, আইপিএফটি ও তিপরা মথার মধ্যে সুবিধাবাদী জোট গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।তিপরা মথার আন্দোলন নিয়েও মুখ খুলেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনের নামে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের ব্যবহার করে অ্যাম্বুলেন্স ও পানীয় জলের গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে, যা মানবিকতার পরিপন্থী। পাশাপাশি রোমান হরফের দাবির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এই দাবি মানছে না। অথচ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ছাত্রছাত্রীদের রোমান ও বাংলা—উভয় হরফেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সংযম, দায়িত্ববোধ ও ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব রয়েছে বলেই মন্তব্য করেন বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী। তাঁর মতে, রাজ্যের স্বার্থে রাজনৈতিক বক্তব্যে আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।