মহারাষ্ট্রের বারামতিতে বুধবার সকালে ঘটে গেল এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা, যাতে প্রাণ হারালেন রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ার। সকাল সাড়ে আটটার কিছু পর বারামতি বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক মুহূর্তে Learjet-45 বিমানটি আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়। বিমানবন্দরের কর্মী ও স্থানীয় মানুষের দাবি, অবতরণের আগে বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে নীচে নেমে আসে এবং তীব্র গতিতে রানওয়ের ধারে গিয়ে আছড়ে পড়ে। প্রচণ্ড শব্দে মাটি কাঁপিয়ে ভেঙে যায় বিমানটি, দেখা যায় চারদিকে আগুন ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী।বিমানে উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার ছাড়াও ছিলেন কয়েকজন সরকারি আধিকারিক, তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মী এবং দুই বিমানকর্মী, যার মধ্যে পাইলট-ইন-কমান্ড ও ফার্স্ট অফিসারও ছিলেন। প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে বিমানে থাকা পাঁচজনের কেউই বেঁচে নেই। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় দমকল, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা। তবে বিমানটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে কোনও যাত্রীকে জীবিত বের করা সম্ভব হয়নি। ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে দেহাবশেষ উদ্ধার করতে বেশ সময় লেগেছে উদ্ধারকারী দলের।প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে যান্ত্রিক ত্রুটির দিকে। তবে আবহাওয়ার সমস্যা বা পাইলটের ভুলও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। বিমান চলাচল দপ্তর একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত। দুর্ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে যেখানে দেখা যায় বিধ্বস্ত বিমানের চারদিকে আগুনের শিখা আর ঘন ধোঁয়ার স্তম্ভ। ভিডিওটি দেখেই মানুষ আঁতকে উঠেছেন।এই দুঃসংবাদের পরই রাজ্য থেকে দিল্লি পর্যন্ত নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের মধ্যে টেলিফোনে জরুরি আলাপ হয়। প্রধানমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, অজিত পাওয়ার ছিলেন এক নিষ্ঠাবান জননেতা, যিনি মহারাষ্ট্রের মানুষের সেবায় অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কোনওভাবেই মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোকজ্ঞাপন করেছেন। তিনি বলেন, বারামতির এই বিমান দুর্ঘটনার খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মহারাষ্ট্রের উন্নয়নে অজিত পাওয়ারের অবদান, বিশেষত সমবায় খাতে তাঁর কাজ, আগামী বহু বছর ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ মৃত্যুবরণকারী সকলের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং এই দুর্ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে উল্লেখ করেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও এক্স-এ পোস্ট করে শোকপ্রকাশ করেছেন।পাওয়ার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শরদ পাওয়ারের বাসভবনে ইতিমধ্যেই মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার এবং তাঁর বোন সুপ্রিয়া সুলে পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে উপস্থিত হয়েছেন। সুপ্রিয়া সুলে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। অন্যদিকে শরদ পাওয়ার মুম্বই থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং যে কোনও মুহূর্তে বারামতির উদ্দেশে রওনা হতে পারেন বলে জানা গেছে।বারামতি বহু দশক ধরে পওয়ার পরিবারের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত। শরদ পাওয়ার, সুপ্রিয়া সুলে এবং অজিত পাওয়ার—এই তিনজনের নেতৃত্বে এলাকা জুড়ে মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছিল। অজিত পাওয়ারের মৃত্যু বারামতির মানুষের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এলাকার সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, অজিত পাওয়ার শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি ছিলেন মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন সহজ-সরল নেতা।অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী মুখ। সমবায় খাত, কৃষক উন্নয়ন, সেচ প্রকল্প এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় তিনি নিজেকে বহুবার প্রমাণ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব সামলানোর পাশাপাশি, উন্নয়নমূলক বহু প্রকল্পে তাঁর সাফল্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সেই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বড় ধাক্কা খেল।দুর্ঘটনার পর রাজ্যের মানুষের মনে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। কীভাবে এমন একটি আধুনিক বিমান অবতরণের সময় নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে? নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে কোনও ত্রুটি ছিল কি না বা সতর্কবার্তা ব্যবস্থা কাজ করেনি কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। বিমান চলাচল দপ্তর জানিয়েছে, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে সত্যিটা সকলের সামনে তুলে ধরা হবে।এই দুর্ঘটনা শুধু মহারাষ্ট্র নয়, গোটা দেশকে শোকাহত করেছে। অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর অসমাপ্ত কাজ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক ভূমিকা আজও মানুষের মনে ভাসছে। একই সঙ্গে নিহত অন্যদের পরিবারও হারালেন তাঁদের প্রিয় মানুষদের। বারামতির আকাশে আজ যে ধোঁয়ার স্তম্ভ উঠেছিল, তা যেন সারাদেশের মনকেই অন্ধকার করে দিয়েছে।