নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত ও সংবেদনশীল বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। নির্যাতিতা নারীদের সময়োপযোগী ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে রাজ্যের ১০টি পঞ্চায়েত এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হচ্ছে ‘নারী আদালত’। বুধবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের কথা জানান পরিবহন মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী।
মন্ত্রী জানান, সমাজে বহু ক্ষেত্রেই সামাজিক লজ্জা, ভয়, কুসংস্কার এবং দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নির্যাতনের শিকার নারীরা অভিযোগ জানাতে পিছিয়ে যান। ফলে বহু ঘটনা অগোচরেই থেকে যায় এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যায়। এই পরিস্থিতি বদলাতেই রাজ্য সরকার নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘নারী আদালত’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে রাজ্যের ১০টি পঞ্চায়েত এলাকায় এই বিশেষ আদালত চালু করা হবে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে ধাপে ধাপে গোটা রাজ্যেই এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর কথায়, “নারী নির্যাতনের অভিযোগ যেন দ্রুত, সংবেদনশীল ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। স্থানীয় স্তরে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের ভিতরে সচেতনতা গড়ে তুলতেও নারী আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।”
যে ১০টি পঞ্চায়েত এলাকায় এই পাইলট প্রকল্প চালু করা হচ্ছে, সেগুলি হল— কদমতলা ব্লকের অধীন ফুলবাড়ি পঞ্চায়েত, চন্ডিপুর ব্লকের অধীন শ্রীরামপুর পঞ্চায়েত, খোয়াই আরডি ব্লকের অধীন পশ্চিম সোনাতলা পঞ্চায়েত, বামুটিয়া ব্লকের অধীন লেম্বুছড়া পঞ্চায়েত, নলছড় ব্লকের অধীন খেদাছড়া পঞ্চায়েত, টেপানিয়া পঞ্চায়েত, দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার বিবেকানন্দ পল্লী পঞ্চায়েত এবং ধলাই জেলার তিনটি পঞ্চায়েত। প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নারী আদালতের কাজকর্ম পরিচালিত হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রতিটি নারী আদালতে থাকবে ৯ সদস্যের একটি বিচারমণ্ডলী কমিটি। এই কমিটিতে গ্রামের সমাজে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং আইনি জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পুরনো দিনের শালিসি সভার আদলে এই কাঠামো গড়ে তোলা হলেও এটি হবে সম্পূর্ণ আইনসম্মত ও সংগঠিত ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত। এর ফলে একদিকে যেমন দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে, তেমনই আইনের শাসন বজায় থাকবে।
নারী আদালতের মাধ্যমে মূলত পারিবারিক হিংসা, যৌন হয়রানি, পণপ্রথা সংক্রান্ত নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন নারী সংক্রান্ত অভিযোগের দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় স্তরেই সমস্যার মীমাংসা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে গুরুতর ও ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা ও আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিভিন্ন মহিলা সংগঠন ও সমাজকর্মীরা। তাঁদের মতে, গ্রামীণ স্তরে নারী আদালত চালু হলে নির্যাতিত নারীরা সহজেই তাঁদের অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং দ্রুত সমাধান পাওয়ার আশা জাগবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় থানায় যেতে নারীরা সংকোচ বোধ করেন, সেখানে এই আদালত অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নেবে।
এছাড়াও, নারী আদালত সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত সভা, আলোচনা এবং আইনি পরামর্শের মাধ্যমে নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হবে। পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা দেওয়া হবে।
সামগ্রিকভাবে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে নারী সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে রাজ্যের প্রতিটি পঞ্চায়েতে নারী আদালত চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও দৃঢ় হবে বলে আশাবাদী প্রশাসন।