ত্রিপুরার রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ বাড়াচ্ছে তিপরা মথা। রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের অপরিহার্য অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরে ফের বিজেপিকে কটাক্ষ করল এই জনজাতি-ভিত্তিক দলটি। মঙ্গলবার রাজধানী আগরতলার চন্দ্র মহলে আয়োজিত যোগদান অনুষ্ঠান ঘিরে তিপরা মথার শীর্ষ নেতৃত্ব বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে সরগরম করে তুলেছে রাজ্য রাজনীতি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও তিপরা মথার গুরুত্বপূর্ণ মুখ বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর হাত ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকে ২১টি পরিবার, মোট ৮৪ জন ভোটার তিপরা মথায় যোগ দেন। নতুন সদস্যদের স্বাগত জানাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ত্রিপুরায় সরকার গঠনে তিপরা মথা ছাড়া কোনও দল এগোতে পারবে না। ২০১৮-তে আইপিএফটির কাঁধে ভর দিয়েই বিজেপি ক্ষমতায় আসে। আবার ২০২৩-এ আমাদের সঙ্গেই তাদের সরকার টিকে আছে। মথা ছাড়া ত্রিপুরায় ক্ষমতা দখল এখন কল্পনাও করা যায় না।”
সাংবাদিক সম্মেলনে দেববর্মা জানান, নবাগতদের মধ্যে রয়েছেন ছাওমনু মণ্ডলের প্রাক্তন সভাপতি মোহন লাল চাকমা, ইন্দ্রজিৎ বণিক, ধনঞ্জয় রিয়াং, প্রেম রঞ্জন চাকমা, রাজেশ চাকমা ও দিনেশ দাস। এছাড়া করমছড়া মণ্ডলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক সুমন্ত দে, লালন ত্রিপুরা ডার্লং, প্রসেনজিৎ শিব, রাজকুমার রিয়াং-সহ আরও একাধিক কর্মী ও সমর্থক এদিন মথায় যোগ দেন। প্রতিমন্ত্রীর আশা— নতুন সদস্যরা আগামী দিনে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিপরা মথা নেতৃত্ব সরাসরি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের কাজকর্মে বেহাল দশা রাজ্যের সাধারণ মানুষের। তাদের দাবি—
- রাজ্যে রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়
- বিদ্যুৎ পরিষেবা অনিয়মিত ও দুর্বিসহ
- এমজিএনআরইজির কাজ কার্যত স্থগিত
- সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব-অনটনে বিপদে
- সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি সরকার ভুলে গেছে
তাদের কথায়, “২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিপরা মথা ২০টি আসনে প্রার্থী না দিলে বিজেপি আজ রাজ্যে টিকে থাকতে পারত না। আমাদের সমর্থনেই তাদের সরকার কার্যত নির্ভর করে আছে।”
তিপরা মথা নেতৃত্বের দাবি, আসন্ন এডিসি ও বিধানসভা নির্বাচনে ত্রিপুরা থেকে বিজেপি কার্যত মুছে যাবে। তারা আরও স্পষ্ট করে বলেন, “ত্রিপুরায় সরকার গঠন করতে হলে তিপরা মথা অপরিহার্য। লবণ ছাড়া যেমন রান্না অসম্ভব, তেমনি মথাকে বাদ দিয়ে কোনও দল ক্ষমতায় আসতে পারবে না।”
মথার বক্তব্য— কৃষক, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প শক্তি এখন তিপরা মথা। তাদের দাবি, সরকারের কাছে উপেক্ষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষায় মথাই একমাত্র কার্যকর বলয়।
তিপরা মথার এই শক্তিশালী বার্তা কার্যত বিজেপির উদ্দেশেই পাল্টা জবাব হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। দুই জোটসঙ্গী দলের এই টানাপোড়েন রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিজেপির সঙ্গে মথার সম্পর্ক বিগত এক বছরে একাধিকবার টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। এবার প্রকাশ্য মঞ্চে মথার এই ক্ষোভ ত্রিপুরার ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে নির্বাচনী সমীকরণে তিপরা মথার ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, তা নিয়েই বিজেপির একাংশে অস্বস্তি বাড়ছে। অন্যদিকে মথা নেতৃত্ব ক্রমাগত বোঝাতে চাইছে— ত্রিপুরার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের অবস্থান ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে।
রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রাজনৈতিক সংঘাত কী প্রভাব ফেলবে— তা সময়ই বলবে। তবে মঙ্গলবারের অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে ত্রিপুরার রাজনৈতিক মাঠে নতুন সুর ও নতুন দোলাচলের ইঙ্গিত দিয়ে গেল।