ত্রিপুরার পর্যটন সম্ভাবনাকে দেশ–বিদেশে নতুনভাবে তুলে ধরতে এবং রাজ্যকে ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগগুলোর কথা তুলে ধরলেন রাজ্যের বিদ্যুৎ, কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী রতন লাল নাথ। জম্পুই পাহাড়ের ভাংমুন মাঠে আয়োজিত ‘ইউনিটি প্রমোফেস্ট ২০২৫’-এর চতুর্থ পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজ্য সরকার নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে যাতে পর্যটনের সামগ্রিক বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হয়।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পর্যটনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, শিল্প–বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী সান্তনা চাকমা এবং প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিন জম্পুই পাহাড়ের নবনির্মিত ও নবসজ্জিত ইডেন ট্যুরিস্ট লজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন মন্ত্রী।তিনি জানান, ত্রিপুরার পর্যটন সম্পদকে দেশ–বিদেশে জনপ্রিয় করে তুলতে প্রথম ‘প্রমোফেস্ট’ আয়োজন করা হয়েছিল ২০২৪ সালে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও রাজ্যের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র—নারিকেলকুঞ্জ, বিলোনিয়া, উদয়পুর, জম্পুই পাহাড় ও নীরমহলে—ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ‘ইউনিটি প্রমোফেস্ট ২০২৫’। উৎসবের শেষ ও সবচেয়ে বড় পর্বটি হবে আগরতলার স্বামী বিবেকানন্দ স্টেডিয়ামে, যেখানে বহু খ্যাতনামা শিল্পী ইতিমধ্যেই অংশ নিয়েছেন এবং আরও বহু শিল্পী অংশগ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে।রাতন লাল নাথ বলেন, “প্রমোফেস্ট কেবল একটি উৎসব নয়; এটি ত্রিপুরার পর্যটন শিল্পকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আধুনিক যুগে পর্যটনকে আর শুধুমাত্র বিনোদন হিসেবে দেখা হয় না—এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তিগুলির একটি। পর্যটনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, রাজস্ব বৃদ্ধি পায়, এবং স্থানীয় মানুষের আর্থ–সামাজিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। প্রমোফেস্টের উদ্দেশ্যও তারই প্রতিফলন—সংস্কৃতির প্রচার, পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি, স্থানীয় হাসপিটালিটি খাতকে শক্তিশালী করা এবং রাজ্যের ব্র্যান্ডিংকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো।মন্ত্রী আরও জানান, গত কয়েক বছরে পর্যটন দপ্তরের ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে ত্রিপুরায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে রাজ্যে মোট পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৪,১৯,৮০৭ জন—যার মধ্যে দেশি পর্যটক ৩,৮০,৫৭৮ এবং বিদেশি পর্যটক ৩৯,২২৯ জন। আর ২০২৪–২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭,০৭,১৭৩ জনে; দেশি পর্যটক প্রায় ৬,২৭,৭০৫ এবং বিদেশি পর্যটক ৭৯,৪৬৮ জন। এই বৃদ্ধিই প্রমাণ করে, ত্রিপুরা এখন দেশের উদীয়মান পর্যটন রাজ্যগুলির একটি।এদিন মন্ত্রী ত্রিপুরার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়নকাজ সম্পর্কেও কথা বলেন। তিনি জানান, একান্ন পীঠের অন্যতম শাক্তপীঠ ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির, নীরমহল, ডুম্বুর লেক এবং ছবিমুরা সহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পর্যটনস্থলের সৌন্দর্যায়ন ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে আরও কিছু কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে।পর্যটনের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের তথ্যও দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পরে কাঞ্চনপুর মহকুমার অধীন অন্তত ৫০ কিলোমিটার জাতীয় সড়ক নির্মিত হয়েছে—যার মধ্যে জম্পুই পাহাড়ও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ৪২.১২ কিলোমিটার রাজ্য সড়ক এবং ৫৭.৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে, ফলে দূর–দূরান্তের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে এবং পর্যটক সংখ্যা বাড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।জম্পুই হিল আর.ডি. ব্লকের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও মন্ত্রী পরিসংখ্যান দেন। মোট ৩,৮৯২ পরিবারের মধ্যে ২০১৮ সালের পর থেকে ২,১৫১ জন উপভোক্তা পিএমএওয়াই–জি এবং পিএম–জনমন প্রকল্পের আওতায় গৃহনির্মাণ বা সহায়তা পেয়েছেন। একই ব্লকে ২,১৬১টি পরিবারে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং ১,৩৮৬টি পিএইচএইচ পরিবারের হাতে দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে রেশনের চাল।অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক ফিলিপ কুমার রিয়াং, সভাধিপতি অপর্ণা নাথ, ত্রিপুরার পর্যটন সচিব ইউ.কে. চাকমা সহ রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগণ, পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা এবং সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জম্পুই পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি আর স্থানীয় মানুষের উচ্ছ্বাস উৎসবে একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করে।মন্ত্রী রতন লাল নাথের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, ত্রিপুরার পর্যটন–অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্যায়ন, সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন এবং স্থানীয় নাগরিকদের আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে ত্রিপুরা ধীরে ধীরে নিজেদের দেশের পর্যটন মানচিত্রে প্রাধান্য বিস্তারের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। ‘ইউনিটি প্রমোফেস্ট ২০২৫’ সেই বৃহত্তর যাত্রারই এক উজ্জ্বল সূচক।