ত্রিপুরার এক ২২ বছর বয়সী তরুণী চেন্নাইয়ে এক বাইক ট্যাক্সি চালকের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটে সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫ সালের ভোররাতে, যখন ওই তরুণী একটি অ্যাপের মাধ্যমে রাতের শেষ প্রহরে বাইক ট্যাক্সি বুক করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চালক সিভাকুমার তাঁকে নির্জন পথে নিয়ে গিয়ে হামলা চালায় এবং পরে বাড়িতে নামিয়ে দেয়।
তরুণীটি চাকরিসূত্রে চেন্নাইয়ে এসেছিলেন এবং ওই রাতে পল্লিকারানাই অঞ্চলে যাওয়ার জন্য বাইক ট্যাক্সি বুক করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাজ শেষে তিনি একই চালককে ফেরার পথে অপেক্ষা করতে বলেন। চালক রাজি হন এবং কিছুক্ষণ পর তাঁকে তুলতেও আসেন। ফেরার পথে সিভাকুমার হঠাৎই স্বাভাবিক রুট থেকে ঘুরে যান একটি অন্ধকার, নির্জন এলাকায়। অভিযোগ, সেখানে গিয়ে তিনি তরুণীকে ভয় দেখিয়ে শারীরিক নিপীড়ন করেন।
এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যেও তরুণী উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসের পরিচয় দেন—তিনি চলার সময়ই নিজের স্বামীকে বার্তা পাঠিয়ে পরিস্থিতির কথা জানান। ঘটনার পর সিভাকুমার তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে চলে যায়, যেন কিছুই ঘটেনি।
বাড়ি পৌঁছে তরুণী সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বামীকে সব জানান, এবং দুজন মিলে টি-৫ ভানাগারাম থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তরুণীর বিস্তারিত বর্ণনা ও অ্যাপের রাইড রেকর্ডের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে।
চেন্নাই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, জিপিএস ডেটা এবং অ্যাপ লগ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা ২২ বছর বয়সী থেনি জেলার বাসিন্দা সিভাকুমারকে সনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। পরদিন মঙ্গলবার আদালতে তোলা হলে তাঁকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়। ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, “অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালানো হয়, এবং প্রমাণ মিলেছে যে ঘটনাটি সত্য। সিভাকুমারের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে।” পাশাপাশি, তরুণীকে মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, যৌন অপরাধ সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী।
ঘটনার খবর জানার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বাইক ভাড়া কোম্পানি সিভাকুমারের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে দেয় এবং জানায়, “আমাদের প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের আচরণের কোনও স্থান নেই। আমরা পুলিশের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছি।” কোম্পানির তরফে আরও জানানো হয়েছে, তারা চালকের রাইড ডেটা ও যাচাইকরণ সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের কাছে সরবরাহ করছে।
চেন্নাই পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ এবং কোম্পানির সহযোগিতা প্রশংসিত হলেও, এই ঘটনা আবারও উন্মোচন করেছে অ্যাপ-ভিত্তিক যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থার ভেতরে থাকা নিরাপত্তাহীনতার দিকগুলো। নারী অধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালা দাবি করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, “এই ঘটনাটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গত দুই বছরে দেশে একাধিক শহরে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে, যা প্রমাণ করে বর্তমান ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ও নজরদারির পদ্ধতিতে গুরুতর ফাঁক রয়েছে।”
ঘটনার পর নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সংগঠনগুলো বেশ কিছু বিষয় সামনে এনেছে, যেমন—
- **রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের অভাব: * অনেক অ্যাপ কোম্পানি যাত্রীদের ট্রিপ চলাকালীন লাইভ ট্র্যাকিং সুবিধা কার্যকরভাবে চালু রাখে না।
- নিয়মিত ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই: চালকদের প্রাথমিক পর্যায়ে একবার যাচাই করেই থেমে যাওয়া উচিত নয়; নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুনরায় অপরাধমূলক রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
- আইনি দায়বদ্ধতা বাড়ানো: কোম্পানিগুলো যদি অভিযোগে গাফিলতি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- লিঙ্গ-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ: সব চালককে বাধ্যতামূলকভাবে নারী যাত্রীদের প্রতি আচরণবিধি ও সংবেদনশীলতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
চেন্নাই পুলিশ নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে, সন্দেহজনক কোনো ঘটনা বা আচরণ চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানাতে। পাশাপাশি জরুরি ফোন নম্বর ও হেল্পলাইন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, “নারী সুরক্ষা কেবল সরকারের দায় নয়; প্রত্যেক নাগরিকের সহযোগিতাই এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।”
এই ঘটনার পর অনেকেই বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রী সেবা যেমন আমাদের জীবন সহজ করেছে, তেমনি অপরাধের নতুন রূপও সৃষ্টি করেছে। রাতের বেলা একা যাত্রা করা নারীদের জন্য নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাপ কোম্পানি, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জরুরি, যাতে অভিযোগের পরে নয়, আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।