দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে ‘গুরুতরভাবে সঙ্কটাপন্ন’ বলে আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ফের তীব্র সমালোচনার সুর চড়াল প্রদেশ কংগ্রেস। বুধবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের আর্থিক সুরক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাতেই বেশি আগ্রহী। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে চালু হওয়া অধিকাংশ কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও অর্থনৈতিক নীতি মূলত নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে সাজানো, যার সঙ্গে জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যের মিল অতি সামান্য।
প্রবীরবাবুর কথায়, স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতির বর্ষণ করেছিলেন, তা ছিল মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। “এ বছর ১৫ আগস্টের বক্তৃতা শোনার পর মনে হয়েছে দেশের প্রধানমন্ত্রী নীতির পথপ্রদর্শক না হয়ে এক রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমনের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন,” বলেন তিনি।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি, দীপাবলির আগে জিএসটি শিথিলকরণের ঘোষণা—এসবকে তিনি ‘ভোট টানার কৌশল’ ছাড়া অন্য কিছু মনে করেন না।তিনি বলেন, “সরকার দাবি করে সাড়ে তিন কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার কাছে কোথাও নয়। বরং সরকারি সংস্থাগুলির ত্রৈমাসিক শ্রমবাজার রিপোর্ট বলছে, দেশে বেকারত্ব বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।”
প্রদেশ কংগ্রেসের এই মুখপাত্র আরও অভিযোগ তোলেন যে, কেন্দ্র ক্রমাগত কর্মসংস্থানের সংকটকে আড়াল করে উন্নয়নের ভেলকিবাজি দেখাচ্ছে। তাঁর মতে, “চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বদলে দেশে আজ কর্মসংস্থানহীনতার কালো মেঘ ঘনিয়ে আছে। যুবসমাজ হতাশ, শিল্পক্ষেত্রে মন্দা, আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা ধুঁকছে।”
বিশেষ করে জিএসটি নীতি নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রবীরবাবুর বক্তব্য, কেন্দ্র ঘোষণা করেছিল দীপাবলির সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থে জিএসটি ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু এর বাস্তব প্রভাব দেখা যাওয়ার আগেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের দর উলটোপথে বাড়তে শুরু করে। তিনি বলেন, “ঘোষণা যত বড়, তার কার্যকারিতা ততটাই ছোট।
সাধারণ মানুষ দোকানে গেলে দাম কমেনি, বরং দাম আরও বেড়েছে। তাই জিএসটি ছাড়ের ঘোষণা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার সুফল কেউ পায়নি।”এদিন মুখপাত্র আরও বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন কেন্দ্রের শিল্পনীতি নিয়ে। তাঁর দাবি, টাটা গ্রুপের সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে ৪৪,২০৩ কোটি টাকা মূলধন অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘স্বচ্ছতা-বহির্ভূত’।
তিনি এও বলেন, “এই অনুদানের মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যেই টাটা গ্রুপ বিজেপির কেন্দ্রীয় তহবিলে ৭৫৮ কোটি টাকা দান করেছে। এটি গণতন্ত্রে বড় প্রশ্ন তোলে—সরকারি সুবিধা কি শুধুই কর্পোরেট ঘনিষ্ঠতার বিনিময়ে দেওয়া হয়?” প্রদেশ কংগ্রেসের অভিযোগ, এই ধরনের আর্থিক সম্পর্ক ‘স্পষ্টভাবে স্বার্থসিদ্ধির ইঙ্গিত’ দেয় এবং সরকারের কর্পোরেটপন্থী মনোভাবকে সামনে আনে।
কংগ্রেসের দাবি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ইতিমধ্যেই দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্বের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং শিল্পক্ষেত্রে মন্দার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে বহুগুণে। প্রবীরবাবু বলেন, “সরকার বলছে দেশ পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ালে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষই আজ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত।
উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে সরকার দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না।”তার সঙ্গে তিনি গণতন্ত্র ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উদ্দেশে একটি আহ্বানও জানান। তাঁর বক্তব্য, “আজ শুধু বিরোধীদের নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের দরকার এক হওয়া। যাঁরা শান্তিপ্রিয়, গণতান্ত্রিক এবং দেশকে সত্যিকারের উন্নতির পথে দেখতে চান, তাঁদের উচিত মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অরাজকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলনে শামিল হওয়া।”
প্রবীরবাবুর মতে, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলি সামনে আনতে বৃহত্তর জনমত সংগঠনের বিকল্প নেই।সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত কংগ্রেস নেতা-নেত্রীরাও একযোগে দাবি করেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকাঠামো টলমল অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই কেন্দ্রকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তাঁদের মতে, সরকার যদি শিল্পক্ষেত্র, কৃষি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ ও সহায়তা না দেয়, তবে সামগ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।শেষে প্রবীরবাবু বলেন, “দেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, ভাঁওতা নয়। কাল্পনিক প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচনী প্রলোভনের রাজনীতি যদি বন্ধ না হয়, তবে তার চরম মূল্য দিতে হবে গোটা দেশকে।