ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঠেকাতে পুজোয় ছুটি বাতিল কর্মীদের কড়া বার্তা রতন লাল নাথের
*ত্রিপুরা বিধানসভায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে রাজ্যবাসী। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে যেখানে ‘বন্দে মাতরম্’ গান গাওয়া হতো না, সেখানে ২০১৮ সাল থেকে প্রতিটি অধিবেশনের সূচনাতেই এই গান গেয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে।
আজ মুক্তধারা অডিটোরিয়ামে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই প্রসঙ্গেই বক্তব্য রাখলেন রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী রতন লাল নাথ।মন্ত্রী বলেন, “প্রায় দেড় শতাব্দী আগে রচিত এই দেশপ্রেমের পবিত্র স্তোত্র আজও কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে অনুরণিত হচ্ছে। ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি গান নয়—এটি এক মন্ত্র, যা জাতীয় ঐক্য, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের প্রতীক।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, এই গান কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং আজও ভারতের জাতীয় চেতনার অঙ্গ।
বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টি থেকে জাতীয় মন্ত্রে উত্তরণমন্ত্রী রতন লাল নাথ জানান, ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেম থেকে ‘বন্দে মাতরম্’ রচনা করেন। পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে তাঁর অমর কীর্তি *আনন্দমঠ* উপন্যাসে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই থেকেই ‘বন্দে মাতরম্’ হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের আহ্বান—একটি মন্ত্র যা মানুষকে জাতীয় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে।তিনি বলেন, “এই মন্ত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কেবল নাগরিক নই, আমরা এক বৃহত্তর জাতির সন্তান। প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের এই যুগেও ‘বন্দে মাতরম্’ আমাদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে আছে।”
ত্রিপুরা বিধানসভায় নতুন ঐতিহ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের আগে পর্যন্ত রাজনৈতিক মতভেদের কারণে ত্রিপুরা বিধানসভায় ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া হতো না। কিন্তু রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, জাতীয় ঐতিহ্য ও চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিটি অধিবেশনের সূচনায় এই গান গেয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এটি জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণের প্রতিফলন বলে মনে করেন মন্ত্রী।
১৫০তম বর্ষ উদ্যাপন: দেশজুড়ে এক নতুন উদ্যোগরতন লাল নাথ ঘোষণা করেন, ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে সারা দেশে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০তম বর্ষ উদ্যাপন শুরু হবে। এই বছরব্যাপী উদ্যাপনে থাকবে সামাজিক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি। উদ্দেশ্য একটাই—দেশপ্রেমের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করা ও জাতীয় ঐক্যকে আরও দৃঢ় করা।তিনি জানান, এই উদ্যাপন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতির প্রতি শ্রদ্ধা ও অঙ্গীকারের প্রকাশ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এতে অংশগ্রহণ করবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও ঐক্যের বোধ জাগিয়ে তোলা হবে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে।
ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ভূমিকামন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, আজাদ হিন্দ সরকারের ঘোষণার সময়ও ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি গাওয়া হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে এই গান ছিল সংগ্রামীদের অনুপ্রেরণা। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, বাল গঙ্গাধর তিলকসহ অসংখ্য নেতার মুখে এই আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। এটি হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রতীক, একটি জাতির আত্মার স্পন্দন।রতন লাল নাথ বলেন, “আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি ছিল আত্মবিসর্জনের মন্ত্র। সেই ঐতিহ্য আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়।”
যুবসমাজের প্রতি বার্তাঅনুষ্ঠানের শেষভাগে যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজ যখন সমাজে ভাষা, ধর্ম ও প্রদেশভিত্তিক বিভাজন রয়েছে, তখন ‘বন্দে মাতরম্’ আমাদের শেখায় আমরা সবাই এক জাতির সন্তান। মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই আমাদের প্রকৃত পরিচয়।”মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ১৫০তম বর্ষ উদ্যাপনের মাধ্যমে ঐক্যের এই বার্তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে। তরুণ প্রজন্ম এই উদ্যাপনের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় গর্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।
আজকের অনুষ্ঠানটি কেবল একটি স্মরণসভা নয়, বরং জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ত্রিপুরা সরকার এই বার্তা দিয়েছে যে রাজনৈতিক পার্থক্য থাকলেও মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা সর্বজনীন।‘বন্দে মাতরম্’—এই দুটি শব্দই ভারতবাসীর অন্তরে অনন্তকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে। দেড় শতাব্দী পেরিয়েও এই গান আজও প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে এক অমলিন আবেগের সুর তোলে।