রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক। জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালার আলোকে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা, মুখ্যসচিব জে. কে. সিনহা, রাজ্য পুলিশের ডিজি অনুরাগ, পাশাপাশি আট জেলার পুলিশ সুপার এবং এসপি পদমর্যাদার অন্যান্য আধিকারিকরা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পুলিশ সদস্যদের পোষাক শুধু দায়িত্ববোধই নয়, এটি তাদের অহংকার ও মর্যাদার প্রতীক। সরকারের তরফে পুলিশের কাজের স্বাধীনতায় কোনোরকম হস্তক্ষেপ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করে জানান। তাঁর মতে, জনগণের কল্যাণে এবং সমাজের সর্বমোট সুরক্ষায় পুলিশকে সবসময় পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ের বৈঠকের প্রেক্ষাপটমুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র উপস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে দেশজুড়ে ডিজি ও আইজি পর্যায়ের পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ভাগ করে নেয়।
সেই নির্দেশনারই রাজ্য-স্তরের পর্যালোচনা হয়েছে আজকের সভায়।তিনি জানান, বৈঠকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশি শক্তির মদতে বিভিন্ন প্রকার উত্তেজনা বা আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা সরকার শনাক্ত করেছে। এই প্রচেষ্টা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা বাস্তবায়নে অগ্রগতিমুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নির্দেশিকার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই ত্রিপুরায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এতে সন্তুষ্ট হয়ে থেমে গেলে চলবে না। নতুন ত্রিপুরা গঠনের লক্ষ্যে রাজ্য পুলিশকে আরও দ্রুত, নিবিড় ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশে বলেন, “নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রতিটি নীতিনির্দেশ প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা ও চর্চা করে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।”মুখ্যমন্ত্রীর মতে, গণতন্ত্র যত শক্তিশালী ও সুরক্ষিত থাকবে, ততই সহজ হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং গার্হস্থ্য হিংসার মতো সামাজিক সমস্যা সমাধান। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জনগণের আস্থা অর্জনের মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে।
সমাজকল্যাণমূলক কাজে পুলিশের ভূমিকাতিনি বলেন, আধুনিক পুলিশিং শুধু অপরাধ দমন নয়; বরং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা থাকা জরুরি। ত্রিপুরা পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছে। সামাজিক সম্পর্ক ও জনমতের দিক থেকে পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে নিয়মিত জনযোগাযোগ ও সেবামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলায় জাতীয় পর্যায়ে ত্রিপুরার অবস্থানআইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে দেশের ২৮টি রাজ্যের তালিকায় পিছন দিক থেকে ত্রিপুরার অবস্থান তৃতীয়। এই অবস্থানকে শীর্ষস্থানে নিয়ে যেতে গেলে রাজ্য পুলিশকে আরও বেশি সতর্ক, দক্ষ ও আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে বলে মনিক সাহা মত প্রকাশ করেন।
তাঁর মতে, এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতো সক্ষমতা ত্রিপুরা পুলিশের রয়েছে।বৈঠকে আলোচিত মূল বিষয়গুলোবৈঠকে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—• রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বর্তমান চ্যালেঞ্জ• বিদেশি মদতে অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টা• কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা• আধুনিক পুলিশিং পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার• সমাজের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক জোরদার• আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় বৃদ্ধিবৈঠকে উপস্থিত উর্ধ্বতন আধিকারিকরা নিজেদের বিভাগের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও মতবিনিময় করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বান—নতুন ত্রিপুরা গড়তে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণসংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরাকে নিরাপত্তা ও সুশাসনের দিক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে পুলিশকে ফ্রন্ট রানার হিসেবে কাজ করতে হবে। তিনি রাজ্যের সমস্ত পুলিশকর্মীকে আরও নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও মানবিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য উৎসাহিত করেন।তিনি জানান, প্রশাসনিক সমন্বয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জাতীয় নির্দেশনার অনুসরণ—এই চারটি ক্ষেত্রই আগামী দিনে ত্রিপুরার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বদলে দেবে।